ঢাকা সোমবার, ২৭ জানুয়ারি ২০২০, ১৪ মাঘ ১৪২৭
২২ °সে

তেলেঙ্গানায় ধর্ষণ :সন্দেহভাজনদের গুলি করে হত্যার ঘটনায় মিষ্টি বিতরণ

পুলিশের গুলিতে চার জন নিহত
তেলেঙ্গানায় ধর্ষণ :সন্দেহভাজনদের গুলি  করে হত্যার ঘটনায় মিষ্টি বিতরণ
ভারতের তেলেঙ্গানায় ধর্ষণের ঘটনায় গ্রেফতার চারজন ‘এনকাউন্টারে’ নিহত হওয়ার পর শুক্রবার সকালে ঘটনাস্থলে জড়ো হয়ে অভিযুক্ত ধর্ষকদের বিরুদ্ধে স্লোগান দেয় স্থানীয় বাসিন্দারা —এএফপি

ভারতের তেলেঙ্গানায় এক তরুণী পশু চিকিত্সককে গণধর্ষণ করে আগুনে পুড়িয়ে মেরে ফেলার ঘটনায় ধৃত চার অভিযুক্ত পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছেন।

তেলেঙ্গানা পুলিশের অতিরিক্ত মহানির্দেশক জিতেন্দ্র জানান, শুক্রবার ভোর ৩টা নাগাদ এই ঘটনা ঘটে। কয়েকদিন জেল হেফাজতে থাকার পরে গত বুধবার ওই চার জনকে পুলিশ নিজেদের হেফাজতে নেয়। পরে গতকাল শুক্রবার অভিযুক্তদের অপরাধ সংগঠন স্থলে, যেখানে ওই পশু চিকিত্সককে ধর্ষণ করে আগুনে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল, সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়। সন্দেহভাজনরা এক পুলিশ কর্মকর্তার বন্দুক চুরি করে পালানোর চেষ্টা করলে তাদের গুলি করা হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে। গত বৃহস্পতিবার ২৭ বছর বয়সী ওই নারীর লাশ উদ্ধার করা হয়—এ ঘটনার তদন্তে পুলিশের নিষ্ক্রিয় ভূমিকার অভিযোগে দেশটিতে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। সন্দেহভাজনদের হত্যার খবর প্রকাশ হওয়ার পরে, ভুক্তভোগীর মা বিবিসিকে বলেছেন যে, ‘ন্যায়বিচার হয়েছে’। এদিকে, এই ঘটনায় মানুষ আতশবাজির পুড়িয়ে উদ্যাপন করছে এবং কয়েক হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে পুলিশের প্রশংসা করছে।

তেলেঙ্গানায় পশু চিকিত্সকের ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় পুলিশকে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল—বিশেষত যখন ভুক্তভোগীর পরিবার পুলিশের বিরুদ্ধে নিষ্ক্রিয় ভূমিকার অভিযোগ আনে। ধর্ষণ ও হত্যার ওই ঘটনার পরে কয়েক হাজার মানুষ হত্যাকারীদের মৃত্যুদণ্ডের দাবিতে তেলেঙ্গানা থানার সামনে বিক্ষোভ করে। দেশের অন্যান্য স্থানেও বিক্ষোভ ও মিছিল হয়েছে। ভারতীয় আইনে ধর্ষণের শিকার নারীদের নাম ব্যবহার করা যায় না।

বিবিসি তেলেগুর দীপ্তি বাথিনী ভুক্তভোগীর পরিবারের বাড়িতে যান, যেখানে প্রতিবেশীদের এই ঘটনায় পটকা ফাটিয়ে এবং মিষ্টি বিতরণ করে উদ্যাপন করতে দেখা যায়। ভুক্তভোগীর মা বলেন, ‘আমি এই অনুভূতি ভাষায় বোঝাতে পারব না। আমার অনেক আনন্দ হচ্ছে আবার দুঃখও লাগছে। কারণ, আমার মেয়ে তো আর ঘরে ফিরবে না।’

‘আমার মেয়ের আত্মা এখন শান্তিতে আছে। ন্যায়বিচার হয়েছে। আমি কখনই ভাবিনি যে আমরা ন্যায়বিচার পাব। আমার মেয়ের সঙ্গে যা হয়েছে, তা যেন অন্য কোনো মেয়ের সঙ্গে না হয়।’ নিহত ওই পশু চিকিত্সকের মায়ের দাবি, ভারতে যেন যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণের আইনটিকে আরও ‘কঠোর’ করা হয়। পুরুষরা যেন নারীদের দিকে তাকাতেও ভয় পায়—কারণ তাদের শাস্তি পেতে হবে। ভুক্তভোগীর বোন জানিয়েছেন, পুলিশের এই ভূমিকা ‘খুবই অপ্রত্যাশিত’।

‘আমি আদালতের বিচারের প্রত্যাশা করছিলাম। এই ঘটনা আমার বোনকে ফিরিয়ে দেবে না, তবে এটি অনেক স্বস্তির। পুলিশের এমন পদক্ষেপের কারণে এখন থেকে কেউ আবার এই জাতীয় কিছু করার আগে দুই বার চিন্তা করবে।’ তিনি বলেন, পুলিশের এমন পদক্ষেপের ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে উদ্যাপন হয়েছে।

২০১২ সালে ভারতের রাজধানী দিল্লিতে একটি বাসে গণধর্ষণে যে মেডিক্যাল শিক্ষার্থী নিহত হয়েছিলেন, তার মাও অভিযুক্তদের এই হত্যার ঘটনার প্রশংসা করেন। তিনি এএনআই সংবাদ সংস্থাকে বলেছেন, ‘এই শাস্তির খবর পেয়ে আমি অত্যন্ত খুশি। পুলিশ অনেক ভালো কাজ করেছে।’

হত্যার ঘটনাস্থল থেকে বিবিসির তেলুগু সংবাদদাতা সতীশ বল্লা বলেছেন, সেখানে প্রায় ২ হাজার মানুষ জড়ো হয়েছে, যার ফলে বিশাল যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। যানবাহনগুলো মহাসড়কে স্থবির হয়ে আছে। সেখান থেকে মানুষ পুলিশকে ধন্যবাদ জানাচ্ছে। এর আগে সাধারণ মানুষ পুলিশের ওপর গোলাপের পাপড়ি ছিটায় এবং মিষ্টি বিতরণ করে।

তবে কয়েকজন, এই ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা এবং পুলিশের সংস্কারের মূল স্থপতি প্রকাশ সিং বিবিসিকে বলেছেন যে, এই হত্যাকাণ্ড সম্পূর্ণভাবে এড়ানো যেত। তিনি বলেন, ‘হেফাজতে থাকা ব্যক্তিদের যখন আদালতে বা অপরাধের জায়গায় নেওয়া হয়, তখন প্রচুর সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত। তাদেরকে বের করার আগে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। হাতকড়া পরাতে হবে এবং সঠিকভাবে তল্লাশি চালাতে হবে। কারণ পুলিশ যদি সতর্ক না হয় তাহলে যে কোনো সময় যে কোনো ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে।’ তবে মি. সিং বলেছেন, ঘটনাটি বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড কি না, সেটা এত তাড়াতাড়ি বলা যাবে না—ভারতে এ ধরনের হত্যাকাণ্ড ‘এনকাউন্টার কিলিং’ নামে পরিচিত। অন্যদিকে বিজেপি নেত্রী মানেকা গান্ধী এভাবে পুলিশ এনকাউন্টারে অভিযুক্তদের মেরে ফেলার নিন্দা করেছেন।

তিনি বলছেন, ‘আমি এই বন্দুকযুদ্ধের বিরোধিতা করি। এটা একটা ভয়াবহ ঘটনা। আইন কেউই নিজের হাতে তুলে নিতে পারে না। বিচার হলে নিঃসন্দেহে এদের ফাঁসির সাজা হতো। বিচারের আগেই যদি গুলি করে অভিযুক্তকে মেরে দেওয়া হয়, তাহলে আদালত, পুলিশ বা বিচার ব্যবস্থার দরকার কী?’

প্রশ্ন তুলেছেন দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালও। তার কথায়, ‘মানুষ এই এনকাউন্টারের কারণে উত্সব পালন করছেন, কিন্তু এটা আমাদের বিচারব্যবস্থা নিয়ে একটা গুরুতর প্রশ্ন তুলে দিল। গোটা দেশের ভাবা দরকার যে, ফৌজদারি বিচার বিভাগ আর তদন্ত বিভাগকে কী করে শক্তিশালী করা যায়।’ ভারতের সংসদেও এ নিয়ে বিতর্ক চলছে এখন।

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
icmab
facebook-recent-activity
prayer-time
২৭ জানুয়ারি, ২০২০
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন