ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
২৭ °সে

‘নো মুশতাক, নো টেস্ট’

‘নো মুশতাক, নো টেস্ট’

জান-ই-আলম, ইন্দোর থেকে

মধ্যপ্রদেশ ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের মিডিয়া ম্যানেজার রাজীব রাইসোডকারের কাছে ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর চেয়েছিলাম। উনি নম্বর দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। কল করতেই ফোনের অন্যপ্রান্তে রাশভারী কণ্ঠের গুলরেজ আলী গত রোববার সন্ধ্যার পর সময় দেন। ইন্দোরের ক্রিকেটার যতীন সাক্সেনা গন্তব্যের কথা শুনে নিজেই ড্রাইভ করে নিয়ে যেতে রাজি হলেন। যতীনের গাড়ি চেপে শহরের একপ্রান্তে শালিমার পাম্পস আবাসিক এলাকায় পৌঁছতে পৌঁছতে সন্ধ্যার আলো নিভে গিয়েছিল।

‘এক্স’ বিল্ডিংয়ের ৪০১ ফ্ল্যাটের কলিংবেল চাপতেই বের হয়ে আসেন দীর্ঘাকায় গুলরেজ আলী। তিনি ভারতের হয়ে বিদেশের মাটিতে প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি করা সৈয়দ মুশতাক আলীর বড়ো ছেলে। তারপরই সাদা-কালো যুগে ভারতের কিংবদন্তি মুশতাক আলী ও তার ক্যারিয়ার, তার ঠিকুজি জানতেই ঘণ্টা দুয়েক কেটে গেল।

১৯১৪ সালে ইন্দোরেই জন্ম মুশতাক আলীর। ঘুমের মধ্যেই ৯০ বছর বয়সে ২০০৫ সালে পরলোকগমন করেন তিনি। ১০ বছর ধরে ভারতের ঘরোয়া ক্রিকেটে চলছে সৈয়দ মুশতাক আলী ট্রফি টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্ট। এখন বিভিন্ন প্রদেশে এই টুর্নামেন্টের ম্যাচ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। অবিভক্ত ভারতবর্ষে মুশতাক আলী ছিলেন বড়ো তারকা ক্রিকেটার। মারকাটারি ব্যাটিংয়ে সিদ্ধহস্ত ছিলেন তিনি। বলিউড, সংগীত জগতেও তার ভক্ত ছিল অনেক। খোদ দিলীপ কুমারই ব্যাটসম্যান মুশতাকের পাড় ভক্ত ছিলেন।

যদিও বাঁহাতি স্পিনার থেকে তার ব্যাটসম্যান হিসেবে রূপান্তরের গল্পটা রোমাঞ্চকরই বটে। গুলরেজ আলী বলছিলেন, ‘বাবা, ১৯৩৬ সালে ইংল্যান্ড সফরে যান। প্রস্তুতি ম্যাচে বাবা প্রথম ম্যাচে ৭০, তৃতীয় ম্যাচে সেঞ্চুরি করেন। তখন টেস্টে ঐ সময়কার অধিনায়ক বিজয় মার্চেন্ট ও বাবাকে দ্বিতীয় ইনিংসে ওপেনিংয়ে পাঠায়। প্রথম ইনিংসে ফলো অন করে দ্বিতীয় ইনিংস শুরু করে ভারত। বাবা ও বিজয় মার্চেন্ট ২০৩ রানের রেকর্ড জুটি গড়েন। রান, মিনিট সমান। ২০৩ মিনিটে ২০৩ রান। আমার বাবা ১১২ রান করেছিল। বিজয় মার্চেন্ট ৭৮ রান করে অপরাজিত ছিল। পরে উনিও সেঞ্চুরি করেছিলেন। তখনই ব্যাটসম্যান হিসেবে তার নতুন ক্যারিয়ার শুরু হয়ে যায়।’

পেশাদার ক্রিকেটার হিসেবে পিতা মুশতাক আলীকে খুব বেশি সময় পাননি ১৯৪৮ সালে জন্ম নেয়া গুলরেজ আলী। তিনি নিজেও ২০ বছর ক্রিকেট খেলেছেন। তার ছেলে আব্বাস আলী খানও সাবেক ক্রিকেটার এবং এখন মধ্য প্রদেশের হেড কোচ। মুশতাক আলীর পরিবারের তিন প্রজন্মের পর আর কেউ ক্রিকেটের সঙ্গে নেই।

ক্রিকেটার মুশতাক আলী মূলত ভারতের প্রথম টেস্ট অধিনায়ক কর্নেল সিকে নাইডুর আবিষ্কার। ইন্দোরের রাজা হোলকারের আমন্ত্রণে অন্ধপ্রদেশ থেকে ইন্দোরে এসে মুশতাক আলীদের বাসার পাশেই আবাস গড়েছিলেন সিকে নাইডু।

ব্রিটিশ আমলে পুলিশের এসপি ইয়াকুব আলীর কাছে চেয়েই তার পুত্র মুশতাককে হায়দরাবাদ নিয়ে যান সিকে নাইডু। সেখানেই হ্যাটট্রিক করেন বাঁহাতি স্পিনার মুশতাক। গুলরেজ আলী বলছিলেন, ‘ওখানে গিয়ে বাবা হ্যাটট্রিক করেন। বাঁহাতি স্পিনার হিসেবে। তারপর ১৯৩৪ সালে ভারতীয় দলে সুযোগ পান।’

ভারতের হয়ে ১১ টেস্ট খেলেছিলেন মুশতাক আলী। ২২৬ প্রথম শ্রেণির ম্যাচে ৩০ সেঞ্চুরিতে ১৩ হাজারের বেশি রান, ১৬২ উইকেটও ছিল তার। সময়ের প্রতি নিষ্ঠাবান মুশতাকের আবার নতুন নতুন কাপড় পড়া, স্ট্রাইল করা, পারফিউম ব্যবহারে বড়ো শখ ছিল। আক্রমণাত্মক ব্যাটিং, স্টাইলিশ চলাফেরার জন্য গোটা ভারতেই বড়ো তারকাখ্যাতি ছিল তার। যার ছাপ পাওয়া যায় গুলরেজ আলীর কথায়, ‘কলকাতায় এমনও হয়েছে, ৪টার সময় আলো চলে যেত। ম্যাচ বন্ধ হয়ে যেত। পরে ৪টা থেকে ৬টা পর্যন্ত দর্শকদের অটোগ্রাফ দিতে হয়েছেন তাকে।’

কলকাতায় তাকে নিয়ে দর্শকদের রীতিমতো বিদ্রোহের ঘটনাও আছে। ১৯৪৮ সালে হয়েছিল এমনটা। গুলরেজ আলী বলেন, ‘কলকাতাতেই আরেকবার নির্বাচকেরা বাবাকে বাদ দিয়েছিলেন। তখন ওখানকার মানুষ বলতে শুরু করে, ‘নো মুশতকাক, নো টেস্ট’। তারপর চাপে পড়ে নির্বাচকেরা তাকে দলে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। ১৯৪৮ সালে সম্ভবত এটি হয়েছিল। দলে ৭০’র বেশি রানও করেছিলেন সেবার। নিউজিল্যান্ড বা অস্ট্রেলিয়া হবে প্রতিপক্ষ।’

কিংবদন্তি পিতার খুব বেশি ক্রিকেটীয় স্মারক সংরক্ষিত নেই গুলরেজ আলীর কাছে। মুশতাক আলীর ব্যবহূত ব্লেজার, প্যান্ট-শার্ট, ব্যাগ সবকিছুই পাতিয়ালা জাদুঘরে রাখা। পুরোনো অ্যালবাম, কর্নেল সিকে নাইডু ট্রফিটা হাতেই পিতাকে নিয়ে স্মৃতির অতলে ডুবে যান সত্তরোর্ধ্ব গুলরেজ আলী।

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
১২ ডিসেম্বর, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন