ঢাকা সোমবার, ২৭ জানুয়ারি ২০২০, ১৪ মাঘ ১৪২৭
২২ °সে

অন্যরকম কান্না

অন্যরকম কান্না

বাজার থেকে ফেরার পথে খবরটা শুনলাম। খবর দিল সিদ্দিকবাজারের আবুল। খবর মোটামুটি ভয়াবহ। সে নাকি আজ দুপুরে গুলিস্তানের মোড়ে মুন্সী জমিরউদ্দিনকে কাঁদতে দেখেছে।

শুনে আমার বুক ধড়ফড় করতে লাগল। তৈয়বের দোকানে দুই মগ চা খেয়েও সেই ধড়ফড়ানি কমল না। একবার মনে হলো আবুল ঠিক বলছে না। আবার মনে হলো, আবুলের কথাই ঠিক।

এক জন মানুষ কাঁদছে—এই খবরে কারো বুক ধড়ফড় করার কথা নয়। কান্না হলো মানুষের ব্যক্তিগত ব্যাপার। সে ইচ্ছে হলে হাসবে, ইচ্ছে হলে কাঁদবে, ইচ্ছে হলে ভেটকি মেরে থাকবে। তবে আজকের ব্যাপারটা একটু আলাদা। তাই কেমন অস্থির লাগছে।

এই মুন্সী জমিরউদ্দিনকে আমি চিনি। হাড়ে হাড়ে চিনি। আমি তার ভাড়াটিয়া ছিলাম। আমার চোখের সামনে তার তিন বছরের ছেলে পানিতে ডুবে মরেছে, সে কাঁদেনি। তার বাবা হজ করতে গিয়ে মোটর দুর্ঘটনায় মারা গেছে, সে কাঁদেনি। তার স্ত্রী দুই বছর ধরে নিখোঁজ, সে খোঁজ নিতে যায়নি। তার এক বোন পোলিও আক্রান্ত, সে তাকে দেখতে যায়নি। সে আজ কাঁদবে কেন?

আবুল যদি হিটলারকেও কাঁদতে দেখত, আমি তার কথা বিশ্বাস করতাম। হালাকু খানের কথা বললেও বিশ্বাস করতাম। কিন্তু মুন্সী জমিরউদ্দিন? এ কেমন করে সম্ভব? আবুলের কি মাথা খারাপ হয়েছে?

আমি তিন মগ চা খেয়ে ফেললাম। তৈয়ব বলল, ‘আপনি এত আপসেট হচ্ছেন কেন?’ আমি কোনো জবাব দিলাম না। তৈয়ব আবার জানতে চাইল, ‘বাড়িওয়ালা কাঁদলে আপনার কী সমস্যা?’ আমি বললাম, ‘সমস্যা আছে।’ তৈয়ব বলল, ‘কেন? আপনার আত্মীয় হয়?’ আমি বললাম, ‘না।’ তৈয়ব বলল, ‘শ্বশুরবাড়ির কেউ?’ আমি এবারও বললাম, ‘না।’ তৈয়ব বলল, ‘তাহলে?’

আমি উঠে দাঁড়ালাম। এখানে নষ্ট করার মতো সময় আমার নেই। হাতে অনেক কাজ।

রাস্তায় নামতেই সোলায়মান চাচার সঙ্গে দেখা। সোলায়মান চাচা বললেন, ‘তোমার মুখ এত শুকনো কেন?’

আমি মহাবিরক্ত হলাম। আগেও খেয়াল করেছি, যখনই কোনো সমস্যায় থাকি, তখনই সোলায়মান চাচার সঙ্গে দেখা হয় আর তিনি অবধারিতভাবে জিজ্ঞেস করেন আমার মুখ শুকনো কেন।

আমি তার কথা শুনেও না শোনার ভান করলাম। হাঁটতে হাঁটতে ভাবলাম, হাজার হোক এক সময়ের বাড়িওয়ালা। একবার দেখতে যাওয়া দরকার। নিশ্চয়ই কোনো বিপদ হয়েছে। নইলে কাঁদবে কেন? কিন্তু...সত্যিই কি কাঁদছে?

আমি মনে মনে নানা যুক্তি দাঁড় করালাম। সবই বাড়িওয়ালার পক্ষে। যেন আমি তার উকিল। আহা বেচারা! বাড়িওয়ালা হলেও মানুষ তো। নিশ্চয়ই এমন কিছু হয়েছে, যার জন্য কাঁদছে। বোন অসুস্থ ছিল, হয়তো মারা গেছে। হয়তো বাচ্চাটার কিছু হয়েছে। বাড়ি নিয়ে মামলা চলছিল, হয়তো মামলায় হেরেছে। হেরে গিয়ে বাড়ি নিলামে উঠেছে। যে ছেলেটা ডুবে মরেছে, তাকে হয়তো স্বপ্নে দেখেছে। স্বপ্নে দেখে কাঁদছে। জীবনে অনেক ভাড়াটিয়ার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছে। অনেককে কষ্ট দিয়েছে। হয়তো এখন সেগুলো মনে পড়েছে। তাই কাঁদছে।

শেষের যু্ক্তিটাই গ্রহণযোগ্য মনে হলো বেশি। এই বাড়িওয়ালা আমাদের অনেক ভুগিয়েছে। জীবন ফালাফালা করে ছেড়েছে। তার জন্যই জাহিদ সাহেবকে মরতে হয়েছে। জাহিদ সাহেবের মেনিঞ্জাইটিস হয়েছিল। এখন যায় তখন যায় অবস্থা। ডাক্তারের হুকুম, মাথায় ক্রমাগত পানি ঢালতে হবে। কিন্তু দেখা গেল, কলে পানি নেই। ব্যাপার কি? ব্যাপার কিছু না। বাড়িওয়ালা কল বন্ধ করে দিয়েছে। আরেকবার বদিউল অ্যাকসিডেন্ট করল। গুরুতর অ্যাকসিডেন্ট। রক্ত দরকার। অপারেশনের জন্য টাকা দরকার। আমরা বাড়িওয়ালার কাছে গেলাম। আবেদন করলাম ওর একমাসের ভাড়া বাকি রাখা হোক। বাড়িওয়ালা রাজি হলো না। বদিউলকে বাড়ি ছাড়তে হলো। এখন হয়তো সেজন্য অনুশোচনা হচ্ছে। অনুশোচনায় কাঁদছে। কিন্তু...আগে কাঁদেনি কেন?

আমি মনে মনে তার পক্ষেও যুক্তি দাঁড় করালাম। মানুষ কি সারাজীবন একরকম থাকে? থাকে না। মানুষ বদলায়। নিজাম ডাকাত হয়ে যায় নিজামুদ্দিন আউলিয়া। খুনি হয়ে যায় সাধু, আবার সাধু হয়ে যায় খুনি। হয়তো বাড়িওয়ালার বেলায়ও তাই ঘটেছে। সন্ন্যাসী-টন্ন্যাসী হয়ে গেছে। আমি গুলিস্তানের দিকে রওনা হলাম। যে কোনো কারণেই হোক বাড়িওয়ালা কাঁদছে। এর কারণ জানতে হবে। দরকার হলে সান্ত্বনা দিতে হবে। হাজার হোক একসময়ের বাড়িওয়ালা। তাকে তো আর ফেলে দেওয়া যায় না। গুলিস্তানে গিয়ে দেখি আবুলের কথাই সত্য। বাড়িওয়ালা ঠিকই কাঁদছে। শুধু বাড়িওয়ালা নয়, আশপাশের সবাই কাঁদছে। কেউ কেউ ফুঁপিয়ে কাঁদছে। কেউ কেউ রুমাল দিয়ে চোখ মুছছে। ব্যাপার কি? ব্যাপার কিছু না। ঢাকায় বায়ুদুষণ বেড়ে গেছে। পথচারীদের চোখ জ্বালা করছে। তাই কাঁদছে।

n লেখক :রম্যরচয়িতা

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
icmab
facebook-recent-activity
prayer-time
২৭ জানুয়ারি, ২০২০
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন