ঢাকা রবিবার, ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
২৩ °সে


বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন

বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন

আফসানা রিজোয়ানা সুলতানা

পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। এটি ভারতের দক্ষিণ পূর্বাঞ্চল ও বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত। বাংলাদেশ ও ভারতের সরকারি নথি ও আন্তর্জাতিক সংস্থার হিসেবে সুন্দরবনের মোট আয়তন ১০০০০ বর্গকিলোমিটার। এর মধ্যে বাংলাদেশের অংশে রয়েছে ৬০১৭ বর্গকিলোমিটার ও ভারতীয় অংশে ৩৯৮৩ বর্গকিলোমিটার। বাংলাদেশের মোট বনাঞ্চলের ৪৭ ভাগই হলো—সুন্দরবন এবং বন বিভাগের রাজস্ব আয়ের অর্ধেকেরও বেশি আসে সুন্দরবন হতে। এ বন থেকে আমরা প্রচুর পরিমাণে কাঠ, জ্বালানি, মাছ, মধু ও মোম সংগ্রহ করে থাকি। প্রতি বছর সুন্দরবন থেকে প্রায় ৯৭০০০ টন গোলপাতা, ২২০ টন মধু এবং ৫০ টন মোম আহরণ করা হয়। এছাড়া বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে এ বন আমাদের দেশকে প্রাকৃতিক দুর্গের মতো রক্ষা করে।

সুন্দরবন লোনা পরিবেশের সব থেকে বড়ো ম্যানগ্রোভ বনভূমি। গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র নদীর মোহনায় এর অবস্থান। ১৯৯২ সালের ২১ মে সুন্দরবন রামসার স্থান হিসাবে স্বীকৃতি পায়। এর ওপর প্রায় ১২ লাখ লোকের জীবন জীবিকা নির্ভরশীল। দেশের অর্থনীতিতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সুন্দরবনের অবদান প্রতি বছর প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের Institute of Forestry and Environmental Science পরিচালিত এক জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে।

সুন্দরবন আমাদের জাতীয় সম্পদ। সুন্দরবনে রয়েছে পৃথিবীর বিখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগার। সুন্দরবনকে ইউনেস্কো ৬ ডিসেম্বর ১৯৯৭ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে ঘোষণা করে।

কয়েক বছর আগে বাংলাদেশের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ট্রাস্টি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড জিওগ্রাফিকাল ইনফরমেশন সার্ভিস এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগ সুন্দরবনের ভূমি ও উদ্ভিদের পরিবর্তনের ধরন নিয়ে দুটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করে। গবেষণা থেকে প্রাপ্য তথ্যানুযায়ী সুন্দরবনের ভূখণ্ড কমছে আর জলাভূমি বাড়ছে। মূলত সুন্দরবনের নদী তীরবর্তী এলাকায় ভাঙনের ফলে সুন্দরবনের আয়তন কমছে বলে গবেষণায় বলা হয়েছে।

অপরদিকে সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে ব্যাপকহারে নৌযান চলাচলের কারণে নষ্ট হচ্ছে প্রাকৃতিক ভারসাম্য এবং জীববৈচিত্র্য। এরই মধ্যে সুন্দরবনের গাছের সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে ব্যাপক হারে। ১৯৫৯ সালে যেখানে প্রতি হেক্টরে গাছ ছিল ২৯৬টি, তা কমে ১৯৮০ তে ১৮০টি এবং ১৯৯৬ সালে ১৪৪টিতে এসে দাঁড়ায়। এভাবে চলতে থাকলে ২০২০ সাল নাগাদ গাছের সংখ্যা দাঁড়াবে মাত্র ১০৯টিতে। বনের প্রধান বৃক্ষ সুন্দরীর সংখ্যাও হ্রাস পাচ্ছে দ্রুত হারে। বনের বৃক্ষের সংখ্যা হ্রাসের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন প্রজাতির পশু-পাখি হারাচ্ছে তাদের আবাসস্থল। ফলস্বরূপ হ্রাস পাচ্ছে পশু-পাখির সংখ্যাও।

ইউনেস্কোর একটি প্রতিবেদন অনুসারে, সুন্দরবনের মিষ্টি পানি প্রবাহের পরিমাণ যত কমছে, লবণাক্ত পানির প্রবাহ ততই বাড়ছে এবং জীব বৈচিত্র্যের পরিমাণ কমছে। এভাবে লবণাক্ততার পরিমাণ বৃদ্ধি পেতে থাকলে সুন্দরবনের অনেক বৃক্ষ ও প্রাণী আগামী কয়েক দশকের মধ্যে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। যার একটি পরিসংখ্যান ওপরে দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া, ব্যাপক হারে বৃক্ষ নিধন, অবৈধভাবে বনের পশু-পাখি শিকার এবং বনের নদীতে বিভিন্ন সময়ে নৌযান ডুবির ঘটনায় বনের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও বাস্তুসংস্থানের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়েছে। সুন্দরবন আমাদের জাতীয় সম্পদ। দেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক অবদানের কথা সবারই জানা। ঘূর্ণিঝড়ের প্রবল বায়ুপ্রবাহ প্রতিহত করতে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখে সুন্দরবন। বনের ঘন সবুজ বেষ্টনী বাতাসকে কয়েকশ মিটার ওপরে ঠেলে দেয়।

সুন্দরবন আমাদের জাতীয় বন, জাতীয় সম্পদ। এ বন রক্ষা করা আমাদের কর্তব্য। প্রথমত, বনের নদীগুলো দিয়ে চলাচলকারী নৌযানগুলোর দিকে নজরদারি বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য সেখানে মিঠা পানি প্রবাহের পরিমাণ বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিতে হবে। এ সমস্যা মোকাবিলায় আমাদের কিছু সুচিন্তিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ উদ্যোগ নিতে হবে যাতে গঙ্গা চুক্তির পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন হয় এবং সুন্দরবনের মিষ্টি পানি প্রবাহের পরিমাণ বাড়ানো যায়। শুধু মিষ্টি পানি প্রবাহের পরিমাণ বাড়ালেই হবে না, নিয়মিতভাবে সুন্দরবনের পানির গুণগতমান, লবণাক্ততা এবং সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকার ভূগর্ভস্থ পানির অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে হবে এবং কোনো সমস্যা হলে তা দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। আমাদের সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সুন্দরবনকে আরো সমৃদ্ধ করে তুলতে হবে। মনে রাখতে হবে সুন্দরবন বাঁচলে দেশ বাঁচবে।

n লেখক :কৃষি অনুষদ, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
০৮ ডিসেম্বর, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন