ঢাকা মঙ্গলবার, ১২ নভেম্বর ২০১৯, ২৮ কার্তিক ১৪২৬
২৬ °সে


সংস্কৃতির শহর ঢাকা

সংস্কৃতির শহর ঢাকা
লিট ফেস্টের দ্বিতীয় দিন গতকাল বাংলা একাডেমিতে ছিল দেশি-বিদেশি দর্শনার্থীদের ভিড় —ইত্তেফাক

রাজধানী ঢাকা কি দিনে দিনে সংস্কৃতির শহর হয়ে উঠছে? নগর জুড়ে জমজমাট অনুষ্ঠান মঞ্চগুলো তো সে কথাই বলে। সারা বছরই নানা ধরনের সাংস্কৃতিক আয়োজনে সরগরম সাংস্কৃতিক অঙ্গন। শীতকালের শুরুতে এর ব্যাপ্তি যায় বেড়ে। সাংস্কৃতিক উত্সব আন্তর্জাতিক মাত্রা নিয়ে উপস্থিত হয় দর্শক-শ্রোতার সামনে। চাকরি, ব্যবসা, যানজট—কংক্রিটের নগরীতে মানুষের জীবনকে যখন যান্ত্রিক করে তোলে, তার বিপরীতে এসব উত্সব যেন মরুভূমির বুকে সবুজ উদ্যানের মতো হাজির হয় মানুষের সামনে। তাহলে কি নতুন পরিচয়ে উদ্ভাসিত হয়ে উঠছে রাজধানী?

এখন কত রকমের অনুষ্ঠানই না হচ্ছে শহর জুড়ে। বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের আয়োজনে উচ্চাঙ্গসংগীতের উত্সব রাজধানী ঢাকাকে সংগীতপ্রেমীদের কাছে নতুন পরিচয়ে পরিচিত করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক লোকসংগীত উত্সব (ফোকফেস্ট) শুরু হবে ১৪ নভেম্বর থেকে। বাংলা একাডেমিতে চলছে আন্তর্জাতিক সাহিত্য উত্সব (ঢাকা লিট ফেস্ট)। শহিদ মিনারে চলছে শীতকালীন পথনাটক উত্সব। আর কদিন বাদেই ১৬ তারিখ থেকে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে শুরু হবে ‘বটতলা রঙ্গমেলা’ শিরোনামে আন্তর্জাতিক নাট্যোত্সব। এমনি করেই শিল্পকলা একাডেমি, শিশু একাডেমি—সবখানেই উত্সবের আমেজে রঙিন হয়ে উঠবে মঞ্চগুলো। এসবের মধ্যে রয়েছে যাত্রা উত্সব, নাট্য উত্সব, নৃত্য উত্সব, নৃত্যনাট্য উত্সব, প্রয়াত বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিদের রচনা নিয়ে নাট্য উত্সব। এর বাইরেও পৌষমেলা, বর্ষাবন্দনা, শরত্ উত্সব, হেমন্তে নবান্ন উদ্যাপনসহ ঋতুভিত্তিক উত্সবগুলোও গ্রামের গণ্ডি পেরিয়ে শহুরে জীবনে ঠাঁই করে নিয়েছে।

এ প্রসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি প্রাবন্ধিক মফিদুল হক বলছেন, বড়ো অনুষ্ঠান হচ্ছে, কিন্তু বড়ো সাংস্কৃতিক অভিঘাত তৈরি করছে কি না, সেটাও তো ভাবতে হবে। তিনি বলেন, এটা ইতিবাচক। মানতেই হবে যে নতুন ধারা বইছে। সমাজের মানষের কাছে সংস্কৃতির চাহিদা সৃষ্টি হচ্ছে। কিন্তু ঢাকা তো বিশাল শহর। এ ধরনের আয়োজন কেন্দ্রিকতা সৃষ্টি করছে কি না, সেটাও তো ভাবতে হবে। তবে একে অগ্রগতি হিসেবে দেখা ঠিক হবে না, শ্লাঘা অনুভব করলেও সেটা ভুল হবে। সব মানুষের জন্য একটা সাংস্কৃতিক ক্ষেত্র সৃষ্টি করতে হবে। রাজধানী জুড়ে অন্তত ১০০ সাংস্কৃতিক ক্ষেত্র সৃষ্টির জন্য এই আগ্রহটাকে কাজে লাগানো যেতে পারে।

শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী বলেন, ‘একাডেমিকে কেন্দ্র করে সারাদেশে সাংস্কৃতিক জাগরণ সৃষ্টি করা হয়েছে। শুধু রাজধানী ঢাকাতেই নয়, সারাদেশই শিল্পকলা একাডেমিকে কেন্দ্র করে উত্সব অনুষ্ঠান আয়োজন হয়ে থাকে। বিষয়ভিত্তিক নাট্য উত্সব করা হচ্ছে ৬৪ জেলায়। সাহিত্যনির্ভর নাটক, মূল্যবোধের নাটক, মুক্তিযুদ্ধের নাটক উত্সব হচ্ছে। এর পাশাপাশি শুধু চলচ্চিত্র নিয়ে সারাদেশে উত্সবের আয়োজন করেছি আমরা। দর্শক সৃষ্টিতে গঠন করা হয়েছে ফিল্ম সোসাইটি। এ সবকিছুই আমারা করছি একটি সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে দেশের মানুষকে যুক্ত করতে। এই যাত্রা এক স্বপ্নপূরণের যাত্রা। আমারা সেই পথে সব সময় নিয়োজিত।’

বাঙালি সংস্কৃতির রাজধানী ঢাকা

ঐতিহাসিক শহর ঢাকার পরিচয় নানা সময়ে ছিল নানা রকমের। মোগল আমলে ঢাকা ছিল ‘বাহান্ন বাজার আর তেপ্পান্ন গলির শহর’, ‘বাগবাগিচা’ আর ‘মসজিদের শহর’, নদী আর খালের শহর (‘ভেনিস অব দি ইস্ট’), ব্রিটিশ আমলেও সুন্দর ছিমছাম বৃক্ষশোভিত রমনা-নীলক্ষেত সমৃদ্ধ এক ‘রোমান্টিক শহর’, চমত্কার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শহর, পাকিস্তান আমলে ‘মশার শহর’ আর ‘আন্দোলনের শহর’। ভাষা আন্দোলন, গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন বা ভোটের আন্দোলন, স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে আন্দোলন, গণ-আন্দোলন, সবশেষে স্বাধীনতার আন্দোলন, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঘোষণা ও মুক্তিযুদ্ধ। স্বাধীনতা-পরবর্তী ঢাকারও নানা পরিচয়, ‘বস্তির শহর’, ‘রিকশার শহর’, ‘নাগরিক সমস্যার শহর’, ‘ভিড়ের শহর, জলজট, যানজটের শহর’, ‘ভাগাড়ের শহর’, ‘নিরাপত্তাহীনতার শহর’, ‘নৈরাজ্যের শহর’ এবং ‘গুমের শহর’। তবে এসব পরিচয়ের বাইরে ঢাকা পরিপূর্ণভাবে একটি ‘সংস্কৃতির শহর’। যে কোনো বড়ো শহরের ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের বিষয়টি জড়িয়ে থাকে। এই তিন পরিচয়ের মধ্যে রাজধানী ঢাকাকে আমরা সাংস্কৃতিক শহর বলতেই পারি অথবা সংস্কৃতির শহর। এই শহরে নানা ধরনের আধুনিক অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, অনুষ্ঠান ও উত্সব আয়োজিত হচ্ছে। সেখানে বিপুলসংখ্যক মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এখানকার বাসিন্দাদের অসাম্প্রদায়িক চরিত্রটিকেও ফুটিয়ে তোলে। তাই ঢাকা এখন ‘বাঙালি সংস্কৃতির’ মেগাসিটি। বাংলা ও বাঙালির নানা সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের সমাহার এ শহরে। এ রকম এক ভাষী ও প্রায় এক জাতির মেগাসিটি বিশ্বে দ্বিতীয়টি খুঁজে পাওয়া সত্যি কঠিন।

নগরজুড়ে সাংস্কৃতিক কেন্দ্র চাই

ঢাকা শহরে অসামপ্রদায়িক বাঙালি সংস্কৃতির সর্বশ্রেষ্ঠ দৃশ্যমান দৃষ্টান্ত অবশ্যই বাংলা নববর্ষ উদ্যাপন। গত পাঁচ দশকে ছায়ানটের নববর্ষ উদ্যাপন রমনার বটমূল থেকে সারা শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। বলা যায় সারা দেশময়। ছায়ানট বর্ষবরণের পাশাপাশ রবীন্দ্র, নজরুল উত্সব, দেশঘরের গান, শুদ্ধসঙ্গীত উত্সব প্রভৃতি আয়োজন করে। এতে অনুপ্রাণিত হয়ে সারাদেশেই বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন ঋতুভিত্তিক ও বিশেষ দিনগুলোতে অনুষ্ঠান আয়োজন করছে। পহেলা বৈশাখে মঙ্গল শোভাযাত্রা ইত্যাদির প্রচলন ও জনপ্রিয়তা ঢাকার এক অসাধারণ রূপ তুলে ধরে।

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ বলেন, উত্সব গ্রামেগঞ্জে ছড়িয়ে পড়েছে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হচ্ছে ব্যাপকভাবে। সেগুলো মিডিয়ায় আসে না। ঢাকাতেও অনেক অনুষ্ঠান হচ্ছে। কর্মকাণ্ড ভালো। কিন্তু সব উত্সবকে ইতিবাচক ধরা ঠিক হবে না। অনেক উত্সব হচ্ছে বাণিজ্যিক উদ্দেশে কিংবা প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনের জন্য। অবকাঠামো সুবিধা না থাকলে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। মিরপুরে ৫০ লাখ মানুষের বাস। অন্ততপক্ষে ২০টি সাংস্কৃতিক ক্ষেত্র বা মিলনায়তন প্রয়োজন।

তবে এটাও সত্যি, রাজধানীতে অসংখ্য সাংস্কৃতিক সংগঠন থাকলেও তাদের অনুষ্ঠান করার জায়গা শিল্পকলা, টিএসসি নয়তো পাবলিক লাইব্রেরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এখানকার দর্শকরাও নির্দিষ্ট। কিন্তু রাজধানীর ব্যাপ্তি অনেক। অনেক মানুষের বাস। এসব মানুষের কাছে পৌঁছানোর মতো অবকাঠামোগত সুবিধা নেই।

এ পরিপ্রেক্ষিতে, পুরো রাজধানীজুড়ে সাংস্কৃতিক কেন্দ্র গড়ে তুলবার কথা বলছেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা। দেখা যায়, সাংস্কৃতিক অবকাঠামো না থাকার কারণে রাজধানীর মানুষের একমাত্র বিনোদনের জায়গা হয়ে উঠেছে রেস্টুরেন্টগুলো। পরিবার নিয়ে খাওয়া-দাওয়া ছাড়া বিনোদনের কোনো ক্ষেত্র নেই।

এ প্রসঙ্গে মফিদুল হক বলেন, ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবরটাকে রেস্টুরেন্ট আর খাবারের দোকানগুলো গিলে ফেলেছে। অথচ এটা খুব সুন্দর সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে রূপান্তর করা যেত। তিনি বলেন, এলাকার স্কুল-কলেজ, ক্লাব সংগঠনকে সাংস্কৃতি কর্মকাণ্ডের প্রতি আগ্রহী করে তুলবার সামগ্রিক উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। তা না হলে উত্সব আয়োজন বড়ো অনুষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ থাকবে, বড়ো সাংস্কৃতিক অভিঘাত সৃষ্টি করবে না।

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
১২ নভেম্বর, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন