ঢাকা শনিবার, ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৬ ফাল্গুন ১৪২৬
২০ °সে

এক দশক জুড়ে ফেসবুকের যত ডাটা কেলেঙ্কারি ও বিতর্ক

এক দশক জুড়ে ফেসবুকের যত ডাটা কেলেঙ্কারি ও বিতর্ক

হাসান বারি

গত এক দশকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের জনপ্রিয়তা নিঃসন্দেহে ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু এ জনপ্রিয়তা নিষ্কণ্টক নয়। গত এক দশকে ব্যবহারকারীদের গোপনীয়তা রক্ষায় ব্যর্থতার দেখা পেয়েছে কোম্পানিটি। এ নিয়ে বিশ্ব জুড়ে হয়েছে সমালোচনা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে তদন্তের মুখে পড়েছে ফেসবুক।

১৫ বছর আগে আত্মপ্রকাশ করে ফেসবুক। বর্তমানে প্রতি মাসে ২৪৫ কোটির বেশি সক্রিয় ব্যবহারকারী থাকার পাশাপাশি গত এক দশকে ডাউনলোড হওয়া শীর্ষ চারটি মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন বা অ্যাপের গর্বিত মালিক ফেসবুক। আবার এর বিপরীত চিত্র দেখা গেছে। ব্যবহারকারীদের তথ্য ফাঁস হওয়া রোধের বিষয়টি নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে কোম্পানিটি। এমনকি ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকা কেলেঙ্কারির আগে থেকেই এ সমস্যা ছিল ফেসবুকের, তদন্তে এমনটাই উঠে এসেছে।

২০১০ সালের এপ্রিলে ওপেন গ্রাফ প্ল্যাটফরম চালু করে ফেসবুক। এটি এমন একটি প্ল্যাটফরম, যেখানে বহিরাগত ডেভেলপারদের ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য জানতে চাওয়ার অনুরোধ অনুমোদন করা হয়। এসব তথ্যের মধ্যে ব্যবহারকারীর নাম, লিঙ্গ, অবস্থান, জন্মদিন ও শিক্ষা-সম্পর্কিত তথ্য অন্তর্ভুক্ত। এ নীতিকে ফেসবুক ব্যবহারকারীদের তথ্যের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি বিবেচনা করেন অনেকেই।

একই বছরের অক্টোবরে ফেসবুকের বেশ কিছু জনপ্রিয় অ্যাপ ব্যবহারকারীসহ তাদের বন্ধুদের নামের মতো ‘শনাক্তকারী তথ্য’ বিজ্ঞাপন ও ইন্টারনেট ট্র্যাকিং কোম্পানিগুলোর কাছে হস্তান্তর করছে বলে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয়। তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে ফেসবুক।

২০১১ সালের জুনে এসে নিজেদের ফেসিয়াল রিগকনিশন (চেহারা পরিচিতি) ফিচার ‘ট্যাগ সাজেশন’ চালু করে ফেসবুক। এ ফিচারের মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই ছবিতে বন্ধুদের চিহ্নিত করতে পারে। সে সময় ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ফেসবুকের নতুন ফিচারটিতে ব্যক্তিগত গোপনীয়তাবিষয়ক কোনো বিধি লঙ্ঘন হচ্ছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা হবে বলে জানিয়েছিল।

নভেম্বরে এসে মার্কিন ফেডারেল ট্রেড কমিশন একটি বিস্তৃত নিষ্পত্তির ঘোষণা দেয়। যেখানে বলা হয়, ফেসবুক আগামী ২০ বছর ব্যবহারকারীর গোপনীয়তা-সংক্রান্ত নির্দেশ অনুসরণ করবে। মূলত ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে ফেসবুক ব্যবহারকারীর অনুমোদন ছাড়াই ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করার পর এ নির্দেশ জারি করা হয়।

২০১২ সালে কোম্পানির আইপিও প্রসপেক্টাসে ফেসবুক নিজেদের ব্যবহারকারীর গোপনীয়তা নিয়ে ভবিষ্যতে সমস্যার মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনার কথা জানায়। এক্ষেত্রে তৃতীয় পক্ষের কার্যক্রম, সফটওয়্যার বাগ বা অন্যান্য প্রযুক্তিগত ত্রুটির জন্য (ব্যবহারকারীর) তথ্য সুরক্ষার্থে গৃহীত প্রচেষ্টাগুলো ব্যর্থ হতে পারে বলেও কোম্পানিটি অগ্রিম জানিয়ে দেয়। তবে বলা হয়, এ ধরনের সমস্যা এড়াতে কিংবা ন্যূনতম মাত্রায় রাখতে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবে।

২০১৩ সালের জানুয়ারিতে গ্রাফ সার্চ ফিচার চালু করে ফেসবুক। অন্য ব্যক্তি, ছবি ও ব্যবহারকারীর পছন্দ বা নির্দিষ্ট কিওয়ার্ডের সঙ্গে মিলে যাওয়া স্থানগুলো খুঁজে পেতে সহায়তা করে ফিচারটি। ফেসবুকের সিইও মার্ক জাকারবার্গ ফিচারটি ‘গোপনীয়তা সংবেদনশীল’ বলে দাবি করেন। এই ফিচারে ব্যবহারকারীদের সঙ্গে এরই মধ্যে যা যা শেয়ার করা হয়েছে, কেবল সেগুলোতেই প্রবেশের সুযোগ থাকার দাবি করা হয়।

একই বছরের আগস্টে ফেসবুকের নিরাপত্তা দলকে একটি বাগ সম্পর্কে সতর্ক করার চেষ্টা করেন এক ডেভেলপার। পরে ডেভেলপার নিজেই বাগটি কাজে লাগিয়ে জাকারবাগের্র ব্যক্তিগত পেজ হ্যাক করে। এ ঘটনায় ফেসবুকের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দেয়।

২০১৪ সালে থার্ড পার্টি অ্যাপগুলো যাতে কেবল অনুমতি পাওয়ার পর ব্যবহারকারীর ডাটায় প্রবেশের সুযোগ পায়, তা নিশ্চিত করতে নিজেদের গোপনীয়তা সুরক্ষানীতি পরিবর্তন করে ফেসবুক।

২০১৫ সালের ডিসেম্বরে সবচেয়ে বড়ো প্রশ্নের মুখে পড়ে ফেসবুক। ব্রিটিশ রাজনৈতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকার কেলেঙ্কারির তথ্য ফাঁস করে গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কিন রিপাবলিকান সিনেটর টেড ক্রুজের প্রেসিডেন্সিয়াল প্রচারশিবিরের হয়ে কাজ করছিল প্রতিষ্ঠানটি। ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকার গবেষকেরা একটি জরিপের মাধ্যমে অসচেতন ফেসবুক ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে প্রার্থী সম্পর্কে ‘বিস্তারিত মনস্তাত্ত্বিক প্রোফাইল’ সংগ্রহ করছিল বলে অভিযোগ ওঠে।

বৈশ্বিক রাজনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বছর ছিল ২০১৬। ঐ বছর ফিলিপাইন ও যুক্তরাষ্ট্রে যথাক্রমে মে ও নভেম্বরে প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। যেখানে রদ্রিগো দুতার্তে ফিলিপাইনের ও ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। কিন্তু উভয় নির্বাচনেই ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকার হস্তক্ষেপের বিষয়টি পরবর্তীতে সামনে চলে আসে।

২০১৬ সালকে ফেসবুকের জন্যও একটি সন্ধিক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ বছরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমটি ‘বিশ্বকে কাছাকাছি আনার’ অনলাইন কমিউনিটি থেকে রাতারাতি বিশ্বের সবচেয়ে বিতর্কিত প্রযুক্তি কোম্পানিতে পরিণত হয়।

২০১৭ সালের ডিসেম্বরে ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্সিয়াল ভবন থেকে আগের বছরের নির্বাচনে প্রচারণার হাতিয়ার হিসেবে দুতার্তের ফেসবুক ব্যবহার নিয়ে আত্মপক্ষ সমর্থন করা হয়। ২০১৮ সালের মার্চে ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকার হুইসেলব্লোয়ার ক্রিস্টোফার ওয়াইলি গার্ডিয়ান ও নিউ ইয়র্ক টাইমসের কাছে প্রতিষ্ঠানটির প্রাথমিকভাবে আনুমানিক ৫ কোটি প্রোফাইল থেকে ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের কথা ফাঁস করে দেন। আলেকসান্দ্র কোগানের তৈরি একটি বিশেষ অ্যাপের মাধ্যমে এসব তথ্য সংগ্রহ করা হয়। অ্যাপটিতে প্রশ্নোত্তরের জন্য প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার ব্যবহারকারীকে অর্থ দেওয়া হয়। ফলে কোগান কোটি কোটি ফ্রোফাইলে প্রবেশের সুযোগ পায়।

ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকা প্রাথমিকভাবে এ অভিযোগ অস্বীকার করলেও কেলেঙ্কারি ফাঁস হওয়ার তিন দিন পর সিইও আলেকসান্দ্রকে বরখাস্ত করা হয়।

একই বছরের এপিলে ফেসবুক ৮ কোটি ৭০ লাখ ব্যবহারকারীর প্রোফাইল থেকে তথ্য সংগ্রহের কথা জানায়। এর মধ্যে ৭ কোটির বেশি ব্যবহারকারী যুক্তরাষ্ট্রের। ফিলিপাইনের ১২ লাখ ব্যবহারকারী রয়েছে।

জুলাই মাসে ‘গুরুতর তথ্য সুরক্ষা আইন ভঙ্গের’ কারণে ফেসবুককে প্রাথমিকভাবে ৬ লাখ ৬৪ হাজার ডলার জরিমানা করা হতে পারে বলে যুক্তরাজ্যের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ঘোষণা দেয়।

ডিসেম্বরে ফেসবুক অবস্থানভিত্তিক বিজ্ঞাপনের জন্য ব্যবহারকারীদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে বলে এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানায় গার্ডিয়ান। এমনকি ব্যবহারকারীরা যদি কোম্পানিকে তাদের ফোনের জিপিএসে ঢোকার জন্য ব্লক করে দেয়, কিংবা ব্যবহারকারী কখনো প্ল্যাটফরমটিতে চেক-ইন না-ও করে, তবু এসব বিজ্ঞাপন তাদের কাছে পৌঁছে যায়।

২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে ফেসবুক ব্যবহারকারীর স্পর্শকাতর স্বাস্থ্য তথ্য সংগ্রহ করতে পারে বলে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানায়। এর পরপরই একটি ত্রুটির কারণে কয়েক কোটি ব্যবহারকারীর পাসওয়ার্ড অভ্যন্তরীণ প্ল্যাটফরমে প্লেইনটেক্সট হিসেবে সংরক্ষিত হতে পারে বলে স্বীকার করে নেয় ফেসবুক।

জুন মাসে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ ক্রিপ্টোকারেন্সি লিবরার ধারণা সামনে আনে। বৈশ্বিক নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো ব্যবহারকারীদের আর্থিক তথ্য সুরক্ষার বিষয়ে ফেসবুকের নিশ্চয়তা দাবি করে। সমালোচনা করেন বিভিন্ন দেশের আইনপ্রণেতা, অর্থনীতিবিদ, কেন্দ্রীয় ব্যাংক, সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা।

জুলাই মাসে ফেসবুককে ৫০০ কোটি ডলার জরিমানা অনুমোদন করে মার্কিন ফেডারেল ট্রেড কমিশন। মার্কিন আইনপ্রণেতা ও নিজস্ব কর্মীদের সমালোচনার মুখে জাকারবার্গ আবারও ফেসবুকে ভুয়া রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনের অনুমতি দেওয়া নিয়ে কোম্পানির সিদ্ধান্তের পক্ষে কথা বলেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক দেশগুলোর জনগণের উচিত রাজনৈতিক নেতারা কী বলছেন তা নিজেই দেখা।

একদিকে তুমুল জনপ্রিয়তা, অন্যদিকে ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা—এ দুই দিক সামলে গত একটি দশক কাটিয়েছে ফেসবুক। তবে আগামী দিনগুলোতে তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিতে আরো বড়ো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে ফেসবুককে।

সূত্র :দ্য গার্ডিয়ান, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ও সিএনএন

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
icmab
facebook-recent-activity
prayer-time
২৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২০
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন