ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
২৭ °সে

তূর্ণার ধাক্কায় দুমড়ে গেল উদয়নের তিন বগি, নিহত ১৬

তূর্ণা নিশীথার সঙ্গে উদয়ন এক্সপ্রেসের সংঘর্ষের ঘটনায় পাঁচ তদন্ত কমিটি গঠন, তূর্ণার চালক ও সহকারীসহ তিন জন সাময়িক বরখাস্ত, আট ঘণ্টা পর ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক
তূর্ণার ধাক্কায় দুমড়ে গেল উদয়নের তিন বগি, নিহত ১৬
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় দুই ট্রেনের সংঘর্ষে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায় উদয়ন এক্সপ্রেসের দুটি কোচ। ভয়াবহ দুর্ঘটনার পর স্বজনের খোঁজে এসেছে অনেকে। উদ্ধার অভিযান দেখতেও ভিড় করেছে উত্সুক জনতা —ইত্তেফাক

ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার মন্দভাগ রেলওয়ে স্টেশনে সোমবার রাত ৩টার দিকে দুই ট্রেনের সংঘর্ষে ১৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন। আহত হয়েছেন নারী-শিশুসহ শতাধিক যাত্রী। রেলওয়ে স্টেশন ও প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী আন্তঃনগর তূর্ণা নিশীথা ট্রেনটি সিলেট থেকে চট্টগ্রামগামী আন্তঃনগর উদয়ন এক্সপ্রেস ট্রেনের মাঝামাঝি বগিতে ঢুকে পড়লে এই দুর্ঘটনা ঘটে।

দুর্ঘটনার পরপরই ফায়ার সার্ভিস স্থানীয় লোকজনকে সঙ্গে নিয়ে উদ্ধারকাজ শুরু করে। পরে পুলিশ সদস্যরাও যোগ দেন। এ ঘটনায় তূর্ণার চালক, সহকারী চালক ও গার্ডকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। রেলওয়ে ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাঁচটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আট ঘণ্টা পর ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয়। এ ঘটনায় রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ রাজনৈতিক নেতারা গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক হায়াত-উদ-দৌলা খান জানিয়েছেন, দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই ১০ জনের মৃত্যু হয়। পরে বিভিন্ন হাসপাতালে আরো ছয় জন মারা যান। আহতদেরকে কসবা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কুমিল্লার বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিত্সা দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে সকালে মুন্না মিয়া (২৫) ও বিকালে মির্জা মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন সৈকত (২৭) নামে দুই জনকে ভর্তি করা হয়েছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে।

দুর্ঘটনায় নিহত প্রত্যেকের পরিবারকে ১ লাখ এবং আহতদের ১০ হাজার টাকা করে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন রেলপথমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন। এছাড়া নিহতদের মরদেহ দাফনে সহযোগিতার জন্য প্রত্যেক পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা করে দেওয়া হবে বলে জেলা প্রশাসক জানিয়েছেন। ঘটনাস্থলের কাছে বায়েক শিক্ষা সদন উচ্চ বিদ্যালয়ে একটি অস্থায়ী ক্যাম্প খোলা হয়েছে। কিছুদিন আগে গত ২৩ জুন সিলেট থেকে ঢাকাগামী আন্তঃনগর ট্রেন উপবন এক্সপ্রেস ব্রিজ ভেঙে খাদে পড়ে পাঁচ জন নিহত হন।

রেলপথ সচিব মোফাজ্জল হোসেন বলেছেন, ঘটনার পর থেকে তূর্ণা নিশীথা এক্সপ্রেসের চালক, সহকারী চালক ও গার্ড পলাতক রয়েছেন। তাদেরকে বরখাস্ত করা হয়েছে।

যেভাবে এই দুর্ঘটনা : ???চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী তূর্ণা নিশীথা সোমবার দিবাগত রাত ২টা ৪৮ মিনিটে শশীদল রেলওয়ে স্টেশন অতিক্রম করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মন্দভাগ রেলওয়ে স্টেশনের দিকে রওনা হয়। মন্দভাগ রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার ট্রেনটি স্টেশনে প্রবেশের আগেই আউটারে থামার জন্য লালবাতি জ্বালিয়ে সংকেত দেন। অন্যদিকে সিলেট থেকে ছেড়ে আসা চট্টগ্রামগামী উদয়ন এক্সপ্রেস কসবা রেলওয়ে স্টেশন ছেড়ে মন্দভাগ রেলওয়ে স্টেশনের প্রবেশপথে অবস্থান করছিল। স্টেশন মাস্টার ট্রেনটিকে মেইন লাইন ছেড়ে দিয়ে ১ নম্বর লাইনে আসার সংকেত দেন। ঐ ট্রেনের চালক ১ নম্বর লাইনে প্রবেশ করার সময় আটটি বগি প্রধান লাইনে থাকতেই অন্যদিক থেকে আসা তূর্ণা নিশীথা ট্রেনের চালক সিগন্যাল (সংকেত) অমান্য করে দ্রুতগতিতে ট্রেন চালান। এ সময় উদয়ন এক্সপ্রেসের মাঝামাঝি তিনটি বগির মধ্যে ঢুকে পড়ে তূর্ণা নিশীথার ইঞ্জিন। এতে উদয়ন এক্সপ্রেসের তিনটি বগি দুমড়েমুচড়ে যায়।

মন্দভাগ রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার জাকের হোসেন চৌধুরী জানিয়েছেন, তূর্ণা নিশীথা এক্সপ্রেস আউটারে মেইন লাইনে থামার সংকেত দেওয়া হয়েছিল। উদয়ন এক্সপ্রেসকে মেইন লাইন থেকে এক নম্বর লাইনে আসার সংকেত দেওয়া হয়েছিল। সেই হিসেবে উদয়ন এক্সপ্রেস এক নম্বর লাইনে প্রবেশ করেছিল। এ সময় তূর্ণা নিশীথা ট্রেনের চালক সংকেত অমান্য করে উদয়ন এক্সপ্রেসকে ধাক্কা দেন। চালকের কারণেই এই দুর্ঘটনা।

ট্রেন যাত্রীরা যা বলছেন : উদয়ন এক্সপ্রেসের যাত্রী তামান্না ইসলাম বলেন, ‘আমাদের ট্রেনটি লাইন ক্রস করছিল। ঐ সময় বিপরীত দিক থেকে আসা তূর্ণা নিশীথা ট্রেনটিকে ধাক্কা দেয়। সামনের বগিতে থাকায় আমি বেঁচে গেছি। পেছনের তিনটি বগির যাত্রীরা বেশি আহত হয়েছেন।’ তূর্ণা নিশীথার যাত্রী মেহেদী হাসান বলেন, ‘উদয়ন এক্সপ্রেস অন্য লাইনে ঢোকার আগেই বিপরীত দিক থেকে এসে তূর্ণা নিশীথা ধাক্কা দেয়। এ সময় আমরা ঘুমিয়ে ছিলাম। পরে তাড়াতাড়ি করে ট্রেন থেকে নেমে পড়ি।’ স্থানীয় বাসিন্দা তৌহিদ রহমান বলেন, ‘আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। রাতে হঠাত্ বিকট শব্দে ঘুম ভেঙে যায়। ঘর থেকে বের হয়ে দেখি, এখানে-সেখানে ছিটকে পড়ে আছে বিভিন্ন বয়সের মানুষের মরদেহ। সবার সঙ্গে মিলে আহতদের উদ্ধার করার চেষ্টা করি।’

দুর্ঘটনার খবর পেয়ে চাঁদপুর থেকে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন আবদুস সামাদ নামে একজন। তিনি জানান, তার বাবা-মা ছিলেন উদয়নের যাত্রী, সিলেট থেকে বাড়ি ফিরছিলেন। রাত সাড়ে ৩টার দিকে তার বাবার ফোন থেকে এক লোক কল করে দুর্ঘটনার খবর দেয়। সামাদ ব্রাহ্মণবাড়িয়া এসে জানতে পারেন, তার বাবা-মা দুজনেই মারা গেছেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া হাসপাতালে চিকিত্সাধীন এক আহত যাত্রী বলেন, তাদের বগির অধিকাংশ যাত্রী ঘুমিয়ে ছিলেন। হঠাত্ বিকট আওয়াজ হয় আর তিনি আসন থেকে ছিটকে পড়ে যান।

হাসপাতালে ভর্তি আরেক কিশোর জানায়, মা, ভাই, দুই বোন আর নানিকে নিয়ে চট্টগ্রাম যাচ্ছিল তারা। দুর্ঘটনায় নানি আর এক বোন পায়ে আঘাত পেয়েছেন। হট্টগোলের মধ্যে মায়ের খোঁজ পাওয়া যায়নি। কুমিল্লা মেডিক্যালে ভর্তি উদয়নের এক যাত্রী বলেন, তার বাড়ি চাঁদপুরের হাইমচরে, সিলেট গিয়েছিলেন মাজার জিয়ারত করতে। ফেরার পথে দুর্ঘটনায় পায়ে আঘাত পেয়েছেন। ঘটনার পর থেকেই ঢাকা-চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম-সিলেট, নোয়াখালী-ঢাকা, নোয়াখালী-সিলেট রেলপথে সব ধরনের ট্রেন চলাচল আট ঘণ্টা বন্ধ ছিল। গতকাল সকাল ১০টা ২৫ মিনিটে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয়। এর আগে দুর্ঘটনায় পড়া ট্রেন সরিয়ে নেওয়া হয়।

নিহত ব্যক্তিদের পরিচয়: দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিরা হলেন চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম রাজারগাঁও গ্রামের মুজিবুর রহমান (৫৫) ও তার স্ত্রী কুলসুম (৪০), সদর উপজেলার উত্তর বালিয়া গ্রামের বিল্লাল মিয়াজির মেয়ে ফারজানা আক্তার (১৫), হাইমচর উপজেলার দক্ষিণ ঈশানপুর গ্রামের মইন উদ্দিনের স্ত্রী কাকলী আক্তার (২০) ও মরিয়ম বেগম (৬), হবিগঞ্জের সৈয়দাবাদ এলাকার আজমত উল্লাহর ছেলে রিপন মিয়া (২৫), সদর উপজেলার বাহুলা গ্রামের ইয়াছিন আরাফাত (১২), চুনারুঘাট উপজেলার তীরেরগাঁও গ্রামের সুজন আহাম্মেদ (২৪), বানিয়াচং উপজেলার মদনমুরক গ্রামের মো. আল-আমিন (৩০), হবিগঞ্জ পৌরসভার আনোয়ারপুর এলাকার বাসিন্দা ও হবিগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের সহসভাপতি আলী মোহাম্মদ ইউসুফ (৩২), বানিয়াচং উপজেলার বড়ো বাজারের মো. সোহেল মিয়ার মেয়ে সোহা মনি (৩), চুনারুঘাট উপজেলার আহমাদাবাদ গ্রামের আবদুল ছালামের স্ত্রী পিয়ারা বেগম (৪১), মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার গাজীপুর গ্রামের জাহেদা খাতুন (৩০), ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরের সোহেল রানার মেয়ে আদিবা আক্তার (২), নোয়াখালীর মাইজদীর শংকর হরিজনের ছেলে রবি হরিজন (২৩) এবং অজ্ঞাত ৪১ বছর বয়সি এক নারী। এই দুর্ঘটনায় শতাধিক যাত্রী আহত হয়েছেন। আহত ব্যক্তিদের কসবা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতাল ও কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।

ঘটনাস্থলে রেলওয়ের ঊর্ধ্বতনরা : দুর্ঘটনার খবর পেয়ে রেলপথ মন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন, রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ মোফাজ্জল হোসেন ও রেলওয়ের মহাপরিচালক সামসুজ্জামান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এরপর তারা অস্থায়ী তথ্যকেন্দ্রে যান। সেখানে তারা নিহতদের স্বজনদের সান্ত্বনা দেন। এ সময় রেলপথমন্ত্রী বলেন, তূর্ণা নিশীথা ট্রেনের চালক, সহকারী চালক ও গার্ড আবদুর রহমানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

এ দুর্ঘটনায় রেল মন্ত্রণালয়, রেলভবন ও বিভাগীয় রেলওয়ে কার্যালয় চারটি এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসন একটিসহ মোট পাঁচটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তদন্ত কমিটিগুলোকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
১২ ডিসেম্বর, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন