ঢাকা বুধবার, ২৯ জানুয়ারি ২০২০, ১৬ মাঘ ১৪২৭
১৮ °সে

প্রশিক্ষণে বদলে যাচ্ছে দিন

প্রশিক্ষণে বদলে যাচ্ছে দিন

আ হ ম ফয়সল

নাসিমা বেগম উন্নত প্রযুক্তিতে হাঁস-মুরগি পালন ও হাঁস-মুরগির খাদ্য তৈরির প্রশিক্ষণ গ্রহণের পর ৪০০ হাঁস কিনে খামার গড়ে তুলেছেন। সাম্প্রতিক বুলবুলের বন্যায় তার ১৫০টি হাঁস মারা গেলেও নাসিমা বেগম মনোবল হারাননি। বর্তমানে ১৫০টি হাঁস ডিম দিচ্ছে। তা বিক্রি করে দৈনিক ১ হাজার ৫০০ টাকা আয় করছেন। নাসিমা বেগম খামার বৃদ্ধি করার জন্য সোনালী ব্যাংক থেকে ১ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছেন। নাসিমা বেগম হাঁসের পাশাপাশি মুরগির খামার গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছেন।

একই ইউনিয়নের মোসা. হাসিনা বেগম। ব্র্রয়লার ককরেল ও টার্কি পালনের ওপর এক মাসব্যাপী প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। হাসিনা বেগম প্রশিক্ষণ-পরবর্তী ৪ হাজার টাকা দিয়ে পাঁচটি টার্কি ক্রয় করেন। এক মাস পর টার্কিগুলো ডিম দেওয়া শুরু করে। সেই ডিম দিয়ে টার্কির বাচ্চা ফুটিয়ে বর্তমানে ৪০টি টার্কি দিয়ে খামার গড়ে তুলেছেন। এ পর্যন্ত তিনি প্রায় ১০ হাজার টাকার ডিম বিক্রি করেছেন। পরিবারে ও সমাজে তার মর্যাদা বৃদ্ধি পেয়েছে।

একই বাড়ির জাহিদা বেগম, সাহেদা বেগম ও হালিমা বেগম প্রশিক্ষণ পাওয়ার পর তিনজনই ভিন্ন ভিন্নভাবে ব্রয়লার সোনালি মোরগের খামার গড়ে তুলেছেন। ইতিমধ্যে তারা মুরগি বিক্রি করে আয় করতে শুরু করেছেন। পার্শ্ববর্তী মঞ্জুপাড়া গ্রামের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত রিনি বেগম প্রশিক্ষণের পর বড়ো ৪০০ ও ছোটো ৪০০ হাঁস দিয়ে খামাড়ের পরিসর বড়ো করেন। রিনি বেগমের স্বামী জাকারিয়া হাওলাদার আগে বাইরে কাজ করতেন, এখন তিনি নিজেদের হাঁসের খামারেই শ্রম দিচ্ছেন। ইতিমধ্যে তিনি ৫০ হাজার টাকার হাঁস বিক্রি করেছেন। ভবিষ্যতে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে খামার বড়ো করবেন বলে জানান।

পায়রা বন্দর এলাকায় সকালের ব্যাচে ইয়াহিয়া, মো. সোহেল মৃদা, মিজানুর রহমান, কাকলি আক্তার, জুথি খানম, নিপা আক্তার, রোকেয়া মৌসুমীসহ ২৫ জন শিক্ষার্থীকে বেসিক কম্পিউটার প্রশিক্ষণ ক্লাসে দেখা গেছে। কম্পিউটার ক্লাসের প্রশিক্ষক সাদিয়া আক্তার ও সুব্রত সিকদার প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। তারা জানান, নির্ধারিত কারিকুলাম ধরে তাদের ছয় মাসের প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। প্রতিদিন দুটি ব্যাচে প্রশিক্ষণ ক্লাস হয়ে থাকে।

রিয়া মণি একজন গৃহিণী। স্নাতক পর্যন্ত পড়ালেখা করেছেন। তিনি তার পরিবারের পক্ষে ছয় মাসব্যাপী বেসিক কম্পিউটার প্রশিক্ষণ গ্রহণ করার সুযোগ পান। তিনি বলেন, এই প্রশিক্ষণ আমার জীবন পালটে দিয়েছে। প্রশিক্ষণ গ্রহণের পর বানাতি বাজারে অগ্রণী ব্যাংকের এজেন্ট শাখায় আমার চাকরি হয়। আমার মাসিক বেতন এখন ১২ হাজার টাকা।

প্রশিক্ষণ-পরবর্তীতে এরকম একের পর এক বাস্তব সাফল্যের গল্প তৌরি হচ্ছে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোতে। পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলায় পায়রা বন্দর নির্মাণের ফলে ক্ষতিগ্রস্তদের স্থায়ী পুনর্বাসনের পর পর্যায়ক্রমে কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে স্বাবলম্বী করা হচ্ছে। পায়রা বন্দর নির্মাণে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এখন পরিবারগুলোর সদস্যদের মধ্যে নতুন করে উন্নয়নের পথযাত্রায় সবার চোখে-মুখে হাসি ফুটছে।

পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় বেসরকারি সংস্থা ‘ড্রপ’ বন্দর নির্মাণে ভূমি অধিগ্রহণে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের যোগ্যতা ও চাহিদা অনুযায়ী জীবনযাত্রার উন্নয়নে বিভিন্ন ট্রেডে প্রশিক্ষণ প্রদান করছে। পায়রা বন্দর নির্মাণে প্রায় ৪ হাজার ২০০ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। প্রতিটি পরিবার থেকে একজনকে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। তিন সপ্তাহ ও এক মাসের প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারীগণ প্রতিদিন ৩০০ টাকা এবং তিন মাস ও ছয় মাসের প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারীগণ প্রতিদিন ৫০০ টাকা করে প্রশিক্ষণ ভাতাও পেয়ে থাকেন।

ড্রপের এই প্রশিক্ষণ প্রকল্পের টিম লিডার জেবা আফরোজা জানান, প্রথম পর্যায়ে ড্রপ আগস্ট ২০১৮ থেকে জুলাই ২০১৯ পর্যন্ত ১ হাজার ১৩৪ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে ১০টি ট্রেডে প্রশিক্ষণ প্রদান করেছে। পরবর্তী সময়ে ড্রপ দ্বিতীয় পর্যায়ে চলতি বছরের অক্টোবর থেকে এপ্রিল ২০২০ পর্যন্ত ২৬টি ব্যাচে মোট ৬৬৬ জনকে প্রশিক্ষণ প্রদান করবে। তার মধ্যে নভেম্বর পর্যন্ত ১৫০ জনকে প্রশিক্ষণ প্রদান সম্পূর্ণ করেছে। প্রতি ব্যাচে সর্বনিম্ন ২৫ জন প্রশিক্ষণার্থী অংশগ্রহণ করে থাকেন। পায়রা বন্দর প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ক্যাপ্টেন এম মুনিরুজ্জামান জানান, সরকার পায়রা বন্দর নির্মাণের ফলে ভূমি ও গৃহ অধিগ্রহণে ক্ষতিগ্রস্তদের পরিবারকে পুনর্বাসনের পর প্রশিক্ষণের মাধ্যমে স্বাবলম্বী করার উদ্যোগ নিয়েছে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিকল্প আয়ের পথ তৈরি করতে তাদের বিভিন্ন ট্রেডে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। ইতিমধ্যে তারা ব্যবসা করে তাদের জীবনমানের উন্নয়ন করতে শুরু করেছে। এক কথায় প্রশিক্ষণ পাওয়ার পর তাদের মধ্যে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে।

কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. মুনিবুর রহমান জানান, ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন জরুরি। পরিবারের উন্নয়নে চাহিদা মোতাবেক তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। মানুষের পেশা পরিবর্তন করা কঠিন কাজ। মানুষিক পরিবর্তনে কাউনসেলিংয়ের মাধ্যমে তাদের মানুষিকভাবে সাহস সঞ্চয় করানো উচিত।

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
icmab
facebook-recent-activity
prayer-time
২৯ জানুয়ারি, ২০২০
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন