ঢাকা রবিবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯, ১ পৌষ ১৪২৬
২০ °সে

‘বদনখানি মলিন হলে আমি নয়ন জলে ভাসি’

‘বদনখানি মলিন হলে আমি নয়ন জলে ভাসি’

‘মজার দেশের মজার কথা বলব কত আর/ চোখ খুললে যায় না দেখা মুদলে পরিষ্কার’ যোগীন্দ্রনাথ সরকারের বিখ্যাত ছড়ার এই লাইনগুলি আমরা প্রতিনিয়ত হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করি। যখনই সম্পাদকীয় লিখিতে কোনো বিষয় নির্ধারণ করা হয়, তখনই চক্ষু মুদিলেই আমরা দেখিতে পাই ‘সব পরিষ্কার’। অদ্য আমাদের নজর কাড়িয়াছে দক্ষিণাঞ্চলে মেয়াদোত্তীর্ণ ফেরি-বিষয়ক একটি সংবাদ। জানা গিয়াছে, ঐ অঞ্চলের ২০টি ফেরির মধ্যে ১৮টির ইঞ্জিনের মেয়াদ কোনোটার এক দশক আবার কোনোটার দেড় দশক পার হইয়া গিয়াছে। এই ১৮টি ফেরির সব কয়টি ইঞ্জিনের সিলিন্ডার, পিস্টন, লাইনারে সমস্যা রহিয়াছে। এইসব ইঞ্জিনে ১২ হইতে ১৩ লক্ষ টাকা খরচ করিয়া যন্ত্রাংশ লাগাইয়া চলাচলের উপযোগী করা হয়। কিন্তু দুই হইতে তিন মাসের মধ্যে উহা আবার বিকল হইয়া যায়। ইঞ্জিনের গোড়ায় গিয়া চক্ষু বস্ফািরিত করিয়া বসিয়া থাকিবার সুযোগ আমাদের নাই। কিন্তু আমরা চক্ষু মুদিলেই দেখিতে পাই, যাহাদের কাছে এই সকল ফেরি ইজারা দেওয়া হয় তাহারা সঠিক সময় ইঞ্জিন অয়েল বা লুব্রিক্যান্ট ব্যবহার করেন না। বিভিন্ন কলকবজায় লুব্রিক্যান্টের পরিবর্তে পাকা কলা ব্যবহার করিয়া থাকেন! অর্থাত্ এইসকল মূল্যবান ইঞ্জিনের সার্ভিসিং প্রায় সম্পূর্ণ অনুপস্থিত।

চক্ষু মুদিলেই আমরা সরকারের পরিবহন সংস্থা বিআরটিসিতেও ঠিক একই চিত্র দেখিতে পাই। এই বাস সার্ভিসের ধরনগুলি হইল সিটি সার্ভিস, আন্তঃনগর সার্ভিস, আন্তর্জাতিক সার্ভিস, স্কুল সার্ভিস, বিশ্ববিদ্যালয় সার্ভিস এবং স্টাফ বাস সার্ভিস। বর্তমানে এই সংস্থার পুরাতন-নূতন লইয়া মোট ২১ শত বাস রহিয়াছে। এইসকল বাসের মধ্যে উচ্চমূল্যের দায়ো, ভলবো, টাটা বাস রহিয়াছে। রহিয়াছে দামি দামি ডাবল ডেকার। অথচ কে তাহা মাথায় রাখে! যেইখানে ব্যক্তিমালিকানাধীন একটি বাস হইতে লাভের টাকায় মালিক বত্সর গুনিলেই আরেকটি বাস চালু করিতে পারেন, সেইখানে বিআরটিসির অর্ধেকের বেশি গাড়ি অকেজো হইয়া ডিপোতে পড়িয়া রহিয়াছে! উল্লেখ্য, বিআরটিসি এইসকল বাসের কিছু ইজারা দিয়া থাকে। আমরা চক্ষু মুদিলেই দেখিতে পাই, এই সংস্থাকে ঘিরিয়া বিশাল একটি চক্র গড়িয়া উঠিয়াছে। নূতন মোবিলের বিল তুলিয়া পুরাতন মোবিল ব্যবহার, নিম্নমানের টায়ার-টিউব ও যন্ত্রাংশ ব্যবহার করিয়া উচ্চমানের যন্ত্রাংশের বিল উত্তোলন একটি নিয়মিত বিষয় হইয়া দাঁড়াইয়াছে। ইহা ছাড়াও এইসকল বাসের সার্ভিসিংয়ের যোগ্য মেকানিক নাই। নাই যথোপযুক্ত এবং প্রয়োজনীয় ওয়ার্কশপ। ইহা ছাড়াও রহিয়াছে কর্তৃপক্ষের সরেজমিনে তদারকির প্রচণ্ড গাফিলতি। মোদ্দা কথা, বিআরটিসি বাস ইজারা নীতিমালা-২০০৭ অনুযায়ী ব্যক্তি পর্যায়ে ইজারা দেওয়া হইয়া থাকে। কিন্তু না ব্যক্তি পর্যায়ে, না সংস্থার তরফ হইতে কোনো দায়বদ্ধতা লক্ষ করা যায়! ইহা খুবই দুঃখজনক যে সরকারি সকল ধরনের সম্পদের প্রতি এক ধরনের ‘হরিলুট’ প্রবণতা বিদ্যমান। চোখ মুদিলেই আমরা দেখিতে পাই জলে, স্থলে সর্বত্র সরকারের সম্পদের এইরকম অবহেলা। দেখিবার যেন কেহ নাই। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় মাতৃভূমির সম্পদের এই ‘মলিন বদন’ই আমাদের চোখে ধরা দেয়। আমরা নয়ন জলে ভাসি।

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
১৫ ডিসেম্বর, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন