ঢাকা বুধবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৯, ২৯ কার্তিক ১৪২৬
২৪ °সে


সুঁইয়ের ফোঁড়ে বর্ণিল কারুকাজ

সুচিশিল্পের অনন্য কারিগর আসমা
সুঁইয়ের ফোঁড়ে বর্ণিল কারুকাজ

‘দূরের ছোট্ট সবুজ গ্রাম। মাটির বেড়ার ঘর। আঁকা-বাঁকা মেঠো পথ, দূরে গাছের সারি। সেই গ্রামের পথ ধরেই বয়ে গেছে কোনো এক নদীর শাখা। সেই নদীর পাড় ধরে বয়ে চলেছে চার বেহারার পালকি...’। ৬০/৭০ বছর আগের গ্রাম-বাংলার এমন চিত্র এখন খুঁজে পাওয়া মুশকিল। তবে এমন চিত্র স্পষ্ট চোখে দেখা যাবে সূচিশিল্পী আসমা আক্তারের সূচিকর্মে। শুধু গ্রাম বাংলার হারিয়ে যাওয়া দৃশ্যই নয়, তিনি সুঁই-সুতোর রঙিন ফোঁড়ে ফুটিয়ে তুলেছেন—আরবিতে লেখা কিছু সুরা, নারীর বাতিঘর বেগম রোকেয়া, বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি, শেখ হাসিনা, ক্রুসবিদ্ধ যিশু খ্রিষ্ট, বাংলার ঐতিহ্য গরুর গাড়ি, যুগলবন্দি রাধাকৃষ্ণ, ফুলের গাছসহ আরো নানা চিত্র। আসমা আক্তার বলেন, এবার ফ্রান্সের একটা প্রদর্শনীতে আমার কিছু সূচিকর্ম যাচ্ছে।

এ যুগের মেয়ে হয়ে সূচিকর্মে উদ্বুদ্ধ হলেন কী করে? এমন প্রশ্নের জবাবে, আসমা আক্তার বলেন, আমার বেড়ে ওঠা নানার বাড়ি লক্ষ্মীপুরে। নানা থাকতেন বাহারাইনে। নানিকে দেখতাম অবসরে নানাভাইয়ের জন্য রুমালে সুঁই-সুতো দিয়ে ফুল ফুটিয়ে তুলতেন। টুপিতে কারুকাজ এঁকে রঙিন করে তুলতেন। পাঞ্জাবির বুকে ও হাতের আস্তিনে নিখুঁতভাবে সেলাই করে চিত্র আঁকতেন। সেই কাজটা নানি এতো আন্তরিকতা আর মনোযোগ দিয়ে করতেন যে, ফুল-পাখি যাই সেলাই করতো, তাই জীবন্ত হয়ে উঠতো। নানির সেই কাজ আমার ভালো লেগে যায়। সেখান থেকেই সূচিকর্মের প্রতি আকৃষ্ট হওয়া বা সুঁই-সুতার প্রতি ভালোবাসা তৈরি।

আমি যখন বেশ ছোটো, তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ি। নানির সেলাই দেখে দেখে আমিও প্রথমে রুমালে কাজ শুরু করি। তারপর নানির দেখাদেখি পাঞ্জাবি করেছি, নকসীকাঁথা করেছি, ঘরের আসবাবপত্রের কাভারে ফুল করেছি। এসবই ধীরে ধীরে নিজের পছন্দের চিত্রগুলো আঁকতে শুরু করি। এ কাজে আমার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই। একরকম ভালোলাগা থেকেই আমার আঁকা ও সেই আঁকা ছবিতে সুঁই-সুতার ফোঁড়ে রঙিন করে তোলা। সুঁই-সুতার কাজের মধ্য থেকে কখন যে আঁকা শিখেছি তা নিজেও বলতে পারব না।

সৌদি আরবে থাকতেন আমার মামারা। তাদের কাছে সূচিকর্মের বিভিন্ন পণ্য পাঠাতাম, পরবর্তীতে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরে, ইতালিতে আমাদের অনেক আত্মীয়-স্বজনের কাছে হাতের কাজের পণ্যসামগ্রী পাঠিয়েছি। যেগুলো বিদেশে অনেক সুনাম কুড়িয়েছে। তবে তাতে আমার আত্মীয়দের ব্যবসার ভিত মজবুত হয়েছে। আমার তেমন কিছু হয়নি। আত্মীয়দের ব্যবসার জন্য ডিজাইন তৈরি করেছি, সেলাই দেখিয়ে দিয়েছি। কোন রঙের সুতোয় কি ফোঁড়ে সেলাই করলে কাজটা ফুটে উঠবে, তা দেখিয়ে দিয়েছি।

বর্তমানে আমি মালয়েশিয়াতে একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে কাজ করছি। এর পাশাপাশি নিজের পছন্দের ২০০ চিত্রকর্ম তৈরি করেছিলাম, একটা প্রদর্শনী করার আশায়। সেখানে আমার পছন্দের বিখ্যাত ব্যক্তি, স্থাপনা, ধর্মীয় স্থাপনার ছবি এঁকেছিলাম। কিন্তু ভাগ্য খারাপ! আমার ফ্ল্যাট থেকে সেসব চিত্রকর্মগুলো চুরি হয়ে যায়। তবে আমিও দমে যাওয়ার মেয়ে নই। আবারও শুরু করি কাজ। গতকাল গুণে দেখেছি, আমার ২৫টা চিত্রকর্ম ইতিমধ্যেই শেষ হয়েছে। আরো কিছু করব। আমি দেশে একটা প্রদর্শনী করতে চাই।

সূচিকর্ম নিয়ে অনেক স্বপ্ন আছে, তবে সেটা ব্যক্তি উদ্যোগে করা সম্ভব নয়। এটার সঙ্গে পৃষ্ঠপোষকতা দরকার। সহায়তা পেলে হয়তো আমার কাজের প্রতিভা দেশে ছড়িয়ে দিতে পারব এবং দেশের মানুষের জন্য সূচিকর্মের কিছু ভিন্ন ঢংয়ের কাজ উপহার দিতে পারব।

তিনি বলেন, দেশের নারীদের অনেক পুরোনো শিল্প সূচিকর্ম। যা মেশিনের এমব্রয়ডারি কাজের ভিড়ে হারিয়ে যেতে বসেছে। আমি সেই সূচিকর্মকে বাঁচিয়ে রাখতে চাই। সূচিকর্ম নিয়ে বৃহত্ পরিসরে কাজ করতে চাই। যেখানে আমার দেশের গ্রাম-বাংলার নারীদের কর্মসংস্থান হবে।

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
১৩ নভেম্বর, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন