ঢাকা সোমবার, ২৭ জানুয়ারি ২০২০, ১৪ মাঘ ১৪২৭
২২ °সে

মনীষী

খান সারওয়ার মুরশিদ

খান সারওয়ার মুরশিদ

খান সারওয়ার মুরশিদ সাহিত্যের বিদগ্ধ মানুষ, যে-ধরনের মানুষ সাধারণভাবে বিবেচিত হন দ্বন্দ্ব-মুখর জাগতিক বাস্তব থেকে কিছুটা যেন দূরের সত্তা। তিনি যে অসাম্প্রদায়িক উদার গণতান্ত্রিক চেতনার বাহক সেটা ধরে নেয়া হয় ইংরেজি সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ ঐতিহ্যে তাঁর সম্পৃক্তির কারণে। পঞ্চাশের দশকের গোড়ায় ‘নিউ ভ্যালুজ’ নামে যে সাহিত্য-সাময়িকী তিনি প্রকাশ করেন তার ভাষা ও বৈদগ্ধ্য বুঝি তাঁকে আরো বেশি করে চিহ্নিত করে দূরের মানুষ হিসেবে। এমনটা ভাবতে চাইলে তো ভাবাই যায়, কিন্তু এমন সরল ও একতরফাভাবে দেখলে এর হদিস খুঁজে পাওয়া যাবে না। বাংলার কাদামাটির বাস্তবতা থেকেই উঠে এসেছিলেন এইসব মানুষ, তাঁদের পঠন-পাঠন, শিক্ষাগ্রহণ, জ্ঞান-সাধনা এক উচ্চমার্গের অধিবাসী করে তোলে তাঁদের; ফলে দেখবার, জানবার ও বলবার ধরনে বদল ঘটতে থাকে অনেক, কিন্তু ধরন পালটে গেলেও সারসত্তায় কি কোনো পরিবর্তন ঘটে, অন্তত সেইসব মানুষদের ক্ষেত্রে যাঁরা দাঁড়িয়ে আছেন শক্ত মাটিতে, ভুঁইফোঁড় কোনো কিছু নন, বরং শেকড় জড়িত করে মাটির অনেক গভীরে।

অসাম্প্রদায়িক, মানবিক, জাতীয়তাবাদী বিশ্বাসে খান সারওয়ার মুরশিদের প্রত্যয়ী হয়ে ওঠার পেছনে কোন কোন কার্যকারণ কাজ করেছে তা আমার ভালোভাবে জানা নেই। আমি কেবল মুগ্ধ হয়ে দেখি তাঁর নিরন্তর পথ-চলা, যে-চলায় কোনো ক্লান্তি নেই, কোনো বিভ্রান্তি-বিভ্রমের সংকটও তেমন প্রভাব ফেলতে পারে না। ১৯৫০ সালের হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা যখন সীমান্তের এপার-ওপার জুড়ে বাংলার জীবন টলিয়ে দিয়েছিল তখন প্রতিরোধের প্রথম কাতারে ছিলেন যেসব বুদ্ধিজীবী তাঁদের মধ্যে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ও কাজী মোতাহার হোসেনের মতো শ্রদ্ধেয় প্রবীণদের পাশে ছিলেন খান সারওয়ার মুরশিদের মতো নবীন শিক্ষক। এই ভূমিকা গ্রহণের জন্য তাঁকে অসাম্প্রদায়িক চেতনার অনুসারী হয়ে উঠতে হয়নি, নিজ জীবনসাধনা ও সাহিত্য-সাধনা তাঁকে এর অন্যথা হতে দেয়নি।

আরো পরে ১৯৬১ সালে যখন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বৈরিতা অগ্রাহ্য করে বিশেষ ঝুঁকি নিয়েই পূর্ববাংলায় রবীন্দ্রজন্মশতবর্ষ উদ্যাপনের আয়োজন দানা বেঁধে উঠল তখন সাহিত্যব্রতী সংস্কৃতিকর্মী তরুণদের অন্যতম কাণ্ডারি হয়ে উঠেছিলেন অধ্যাপক খান সারওয়ার মুরশিদ। পরে এ-প্রসঙ্গে এক আলোচনায় তিনি বলেছিলেন যে, কোনোরকম ভয়ের কথা তাঁর মনে হয়নি, কেবল দ্বিধান্বিত ছিলেন এই ভেবে যে, শতবার্ষিকী কমিটির সম্পাদক পদগ্রহণের যোগ্য তিনি কি না। এই উক্তিটিতে একটি স্বাভাবিকত্ব কাজ করে, অথচ পাকিস্তানি আমলে কাজটি ছিল অস্বাভাবিক, আর সেটা এমন স্বাভাবিকভাবে সম্পাদনের জন্য প্রয়োজন হয় অনেক শক্তির যা খান সারওয়ার মুরশিদ আহরণ করেছিলেন একান্ত সাধনার দ্বারা।

উনিশ শ একাত্তরের মার্চ মাসের প্রথম দিনে সেনাশাসক জেনারেল ইয়াহিয়া খান আসন্ন জাতীয় পরিষদ অধিবেশন একতরফাভাবে বাতিল ঘোষণা করলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি সেই সন্ধ্যায় ত্বরিত যে-সভা অনুষ্ঠান করে আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি ব্যক্ত করে সেখানে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন খান সারওয়ার মুরশিদ। এরপর মুক্তিযুদ্ধে তাঁর নিবিড় সম্পৃক্তি, প্রবাসী সরকারের দায়িত্বশীল কর্তব্য পালন—এসব ছিল স্বাভাবিক ঘটনাধারা, যদিও এজন্য পোড়াতে হয়েছে অনেক কাঠখড়, ভয়ের প্রশ্নটি মনে উদিত যদি নাও হয়ে থাকে জীবনমরণের পার্থক্যরেখা তখন হয়েছিল প্রায় অবলুপ্ত।

আমার চোখে খান সারওয়ার মুরশিদের যে-ছবি উজ্জ্বলভাবে প্রতিভাত হয় তা বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পটভূমিকায় বাংলাদেশ জ্বলে-ওঠা আগুনের মধ্যকার দৃশ্য। মোগল আমলের এক অনন্য স্থাপত্য-কীর্তিকে সিএনএন-বিবিসির সচল ক্যামেরার সামনে এমন বর্বরভাবে যে গুঁড়িয়ে দেওয়া যায় তা ছিল প্রায় অবিশ্বাস্য এক ঘটনা। এর ফলে সাধারণ মানুষের মনে যে অভিঘাত সৃষ্টি হয় তা ব্যবহার করে সাম্প্রদায়িকতাবাদী গোষ্ঠী আরেক বর্বরতার অবতারণা ঘটায়। এমনি বিরূপ বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে হতবিহ্বল হয়ে পড়েছিল শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ, মনে হচ্ছিল আবেগ-উত্তাল এই পরিস্থিতিতে বিশেষ কিছু বোধহয় করবার নেই, পরিস্থিতি শান্ত হলে তখন নামা যাবে মাঠে। সেই বৈরী পরিবেশে মুষ্টিমের কিছু মানুষ শান্তি ও সম্প্রীতির আবেদন নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন প্রেসক্লাবের সামনের ফুটপাথে, তাঁদের মধ্যমণি হয়েছিলেন খান সারওয়ার মুরশিদ, পরিস্থিতি বিবেচনার চাইতে কর্তব্যের ডাক তাঁর কাছে বড়ো মনে হয়েছিল, বরাবরের মতোই সেই চরম দুর্দিনেও।

তাঁকে জানাই সালাম। (নির্বাচিত অংশ)

সূত্র :খান সারওয়ার মুরশিদ সংবর্ধনা-গ্রন্থ

(বাংলা একাডেমি, ২০১২)

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
icmab
facebook-recent-activity
prayer-time
২৭ জানুয়ারি, ২০২০
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন