ঢাকা মঙ্গলবার, ২৮ জানুয়ারি ২০২০, ১৫ মাঘ ১৪২৭
১৫ °সে

চয়ন

সুন্দর

সুন্দর

কী সুন্দর এবং কী সুন্দর নয় এ নিয়ে ভারি গোলমাল বাধে যে রচনা করছে এবং যারা রচনাটি দেখছে বা পড়ছে কিংবা শুনছে তাদের মধ্যে; কেননা সবারই মনে একটা করে সুন্দর অসুন্দরের হিসেব ধরা রয়েছে, সবাই পেতে চায় নিজের হিসেবে যা সুন্দর তাকেই, কাজেই অন্যের রচনার সৌন্দর্যের হিসেবে সে নানা ভুল দেখে।

নিজের রচনাকে ইচ্ছে করে খারাপ করে দিতে কেউ চায় না, যথাসাধ্য সুন্দর করেই রচনা করতে চায় সবাই, কেউ পারে সুন্দর করতে কেউ বা পারে না। আমার হাতে বাঁশি দিলে বেসুরে বাজবেই, অকবি যে সে কবিতা লিখতে গেলে মুশকিলে পড়বেই। কচ্ছপ জলে বেশ সাঁতার দিত কিন্তু বাতাসে গা ভাসান দেওয়া তার পক্ষে এক নিমেষও সম্ভব হয়নি, অথচ আকাশে ওড়ার মতো কবিতা ছবি ইত্যাদি রচনার ঝোঁক তাবত্ মানুষেরই মধ্যে রয়েছে। গান শুনে মনে হয় বুঝি আমিও গাইতে পারি, মন মেতে ওঠে এমন যে ভুল হয়ে যায় সুরের পাখি বুকের খাঁচায় ধরা দেয়নি একেবারেই। বালক যখন সুরে বেসুরে তালে বেতালে মিলিয়ে নেচে গেয়ে চলল তখন তার সব অক্ষমতা সব দোষ ভুলিয়ে দিয়ে প্রকাশ পেলে শিশুকণ্ঠের এবং সুকুমরার দেহের ভাষাটির অপূর্ব সৌন্দর্য, কিন্তু বড়ো হয়ে ছেলেমো করা তো সাজে না একেবারেই! তবেই দেখা যাচ্ছে স্থান কাল পাত্র হিসেবে সুন্দর ও অসুন্দর এই ভেদ হচ্ছে নানা রচনার মধ্যে। হরিণ সে বাঁশি শুনে ভোলে, সাপ সে বাঁশি শুনে ফণা তুলে তেড়ে আসে, সাপ-খেলানো বাঁশি সাপের কানে সুন্দর সুর দিলে, মানুষের কানে হয়তো খানিক সেটা ভালো ঠেকল, তাই বলে বিয়ের রাতে সানাই উঠিয়ে নহবত্খানায় সাপুড়ে এনে বসিয়ে দেয় কেউ? অবশ্য রুচিভেদে গড়ের বাদ্যি ঢাকের বাদ্যি বিয়ের রাতে এসে জোটে, ঘুমন্ত পাড়ার কানের শ্রবণশক্তি তেজস্কর পদার্থ দিয়ে জাগিয়ে দিয়ে কনসার্টের দলও অলিতে-গলিতে এসে আবির্ভূত হয়; কিন্তু নিজের মনকে প্রশ্ন করে দেখ, সে নিশ্চয়ই বলবে যে কিছুক্ষণের জন্য বলেই এসব সইছে; ঢাকের বাদ্যি থাকলেই মিষ্টি—এটা মানুষের মন বলেই দিয়েছে বহুকাল আগে, কিন্তু প্রতি সন্ধ্যায় আকাশ ভরে যে শাঁখ ঘণ্টা বাজে তার স্বরমাধুর্য সম্বন্ধে অন্য মত কারো আছে বলে তো বোধ হয় না। গড়ের বাদ্যি গড়ের মাঠে সুন্দর লাগে, মন্দিরের শাঁখ ঘণ্টা দূরে থেকেই ভালো লাগে। সভাস্থলে বীণা বেণু মন্দিরা, ঘরের মধ্যে সোনার চুড়ির ঝিনঝিন স্থান কাল পাত্রের হিসেবে সুন্দর অসুন্দর ঠেকে। মাঠ ছেড়ে গড়ের বাদ্যি যদি ঘরের মধ্যে ধুমধাম লাগায় তবে সে স্থান কাল পাত্রের হিসেব ডিঙিয়ে চলে ও সেই কারণেই ভারি বিশ্রী ঠেকে কানে। মন্দির যখন নদীর ওপার থেকে আরতির ঝনঝন অনেকখানি বাতাস আলো দিয়ে ধুয়ে পাঠায় এপারে তখনি সুন্দর ঠেকে সেটি। সন্ধ্যাপ্রদীপ সন্ধ্যাতারা একজন খুব ঘরের কাছে অন্যজন খুব দূরের কিন্তু সুন্দর হিসেবে দুজনে সমান বলে আলোর তীক্ষতা স্তিমিত করে নিয়ে দুজনেই সুন্দর হলো মানুষের চোখে! (অংশ)

লেখকের ‘বাগীশ্বরী শিল্প প্রবন্ধাবলী’ বই থেকে

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
icmab
facebook-recent-activity
prayer-time
২৮ জানুয়ারি, ২০২০
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন