আবরারের লাশ সিঁড়িতে রেখেই খেলা দেখে ও রাতের খাবার খায় খুনিরা

প্রকাশ : ০৯ অক্টোবর ২০১৯, ১০:৫৬ | অনলাইন সংস্করণ

  অনলাইন ডেস্ক

আবরার হত্যাকাণ্ডে গ্রেফতারকৃতরা। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) হলগুলোতে ছাত্রলীগ ক্যাডারদের মারপিট, মাস্তানি ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। ছাত্রলীগের মতাদর্শের বাইরে কেউ কথা বললেই তাকে নানাভাবে হেনস্থাসহ মারপিট করা হতো। ফলে রবিবার রাতে আবরার ফাহাদকে যখন বুয়েটের শের-ই বাংলা হলের ২০১১ রুমে মারধর করা হচ্ছিল- তখন সেটিকে সাধারণ ছাত্ররা নিত্যদিনের ঘটনা বলেই ধরে নিয়েছিল। ঘটনাস্থল পরিদর্শনকারী ঢাকা মহানগর পুলিশের একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা এ তথ্য জানিয়েছেন।

এ ব্যাপারে মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট একজন পুলিশ কর্মকর্তা জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃতরা আবরারকে মারধরের কথা স্বীকার করেছে। তবে তাদের একজনের ভূমিকা ছিল একেক রকমের। তাদের মধ্যে কেউ কেউ লাঠি দিয়ে প্রহার করে। কেউবা উপস্থিত থেকে মারপিটের দৃশ্য উপভোগ করে। 

লাঠি, স্ট্যাম্প দিয়ে কয়েক ঘণ্টা ধরে চলে অমানুষিক নির্যাতন। এতে রক্তাক্ত হয়ে যায় আবরার ফাহাদের পুরো শরীর। এরপরও পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন বর্ষের নেতারা এসে পালাক্রমে পিটায় আবরারকে। বিরামহীন পিটুনিতে নেতিয়ে পড়া জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা আবরারের গোঙানিও যায়নি খুনিদের মনে। বরং মৃত ভেবে তাকে ধরাধরি করে সিঁড়িতে রেখে নিশ্চিন্তে টেলিভিশনে লা লিগার ফুটবল ম্যাচ দেখছিল তারা। এমনকি সেখানে রাতের খাবারও খেয়েছে ঘাতকরা। 

হত্যাকাণ্ডের দিন হলে অবস্থান করা শিক্ষার্থীরা এমন তথ্য জানিয়েছেন। ঘাতক সন্দেহে এমন ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাদের অনেকে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা বর্ণনা দিয়েছে কি নির্মমতায় হত্যা করা হয়েছে আবরারকে। 

জানা যায়, আবরার থাকতেন শেরেবাংলা হলের নিচতলার ১০১১ নম্বর রুমে। রবিবার বিকালে পলাশী থেকে চা-নাস্তা খেয়ে নিজ রুমে যান তিনি। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে হলের ২০১১ নম্বর রুমে তাকে ডেকে পাঠান হলের বড় ভাইরা। তাকে ডেকে নেন ৩ জন। এরপর সেখানে আবরারের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ও ম্যাসেঞ্জার পরীক্ষা করেন তারা। তার সর্বশেষ ফেসবুক স্ট্যাটাস নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

ফেসবুক স্ট্যাটাস নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের পর্যায়ে তাকে মারধর শুরু করে ছাত্রলীগ নেতারা। কয়েক ঘণ্টা ধরে চলে অমানুষিক নির্যাতন। পরে রাত ১০ টার দিকে আবরারের জন্য তার রুম থেকে আলাদা কাপড়ও নিয়ে যাওয়া হয়। 

আরও পড়ুন:  মা হিসেবে আবরার হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার করবো: প্রধানমন্ত্রী

আবরারের এক বন্ধু জানান, আমাদের ধারণা, রক্তাক্ত হয়েছে আবরার। ২০১০ নম্বর রুম থেকেও থেকে শোনা যাচ্ছিল চিৎকারের শব্দ। আবরারের সেই বন্ধু রাত ২টার দিকে চিৎকার শুনে ছুটে গিয়ে দেখেন, একটি তোশকের মধ্যে শোয়ানো আবরার। ব্যথায় কাতরাচ্ছিলেন। বলছিলেন, আমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাও। এর কিছু সময় পর অ্যাম্বুলেন্স ও ডাক্তার আসার আগেই মৃত্যু হয় আবরার।

আবরারকে তার রুম থেকে ডেকে নেয়ার পর প্রায় ৪/৫ ঘণ্টা ধরে নির্যাতন চলে। কিন্তু এসময় তার চিত্কার শুনে আশপাশের রুম থেকে কেউ এগিয়ে এলোনা কেন? এ সময় কি ছাত্রলীগ ক্যাডারারা ওই রুমের দরজা জানালা বন্ধ করে মারধর করেছে -এমন প্রশ্নের জবাবে পুলিশের এক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এমন প্রশ্ন আমাদের মনেও জেগেছিল। কিন্তু হলের সাধারণ ছাত্রদের কাছ থেকে এর যে জবাব পেয়েছি তা দুঃখজনক। তারা জানিয়েছে, গত কয়েক বছর ধরে ছাত্রলীগ ক্যাডাররা হলগুলোতে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। হলের বিভিন্ন রুমে তারা যখন তখন মদের আড্ডা জমাতো। পাশাপাশি তাদের মতাদর্শের বাইরে কাউকে মনে হলেই তাকে যে কোন রুমে নিয়ে মারধর করতো। ছাত্রলীগ ক্যাডারদের ভয়ে কেউ ‘টু’ শব্দটি করতো না।

উল্লেখ্য, রবিবার রাত তিনটার দিকে বুয়েটের শের-ই-বাংলা হলের একতলা থেকে দোতলায় ওঠার সিঁড়ির মাঝ থেকে আবরারের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ওই রাতেই হলটির ২০১১ নম্বর কক্ষে আবরারকে পেটান বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা। ময়নাতদন্তে তার মরদেহে অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে।

ইত্তেফাক/জেডএইচডি